ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে মিলেছে বিস্ময়কর চিত্র। ভোটে অংশ নেওয়া ৫০টি দলের মধ্যে ২৮টি দল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাবে তাদের দলীয় নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছে ‘শূন্য’। অর্থাৎ প্রার্থী দেওয়া ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরও এসব দল দাবি করেছে, দলীয়ভাবে তাদের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। অংশগ্রহণকারী দলের প্রায় ৫৬ শতাংশের এমন হিসাবের পর ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দল হিসেবে অতিরিক্ত ব্যয় করা যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি কোনো ব্যয় না দেখানোও অস্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশ করা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যয় শূন্য দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে দল হিসেবে কোনো ব্যয় করিনি। তাই ব্যয় শূন্য দেখিয়েছি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি এবং দলীয়ভাবেও কোনো টাকা দেইনি। তাই আমাদের নির্বাচনী ব্যয় শূন্য।’
আরও পড়ুন: একবছরে বিএনপির ব্যয় বেড়েছে তিনগুণ
একইভাবে জনতার দলও নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে শূন্য দেখিয়েছে। দলটির মহাসচিব মো. আজম খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের জন্য আমরা প্রার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি এবং দলীয়ভাবেও কোনো টাকা দেইনি। এ কারণে নির্বাচনে আমাদের দলের ব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে ‘শূন্য’ দেখানোর বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বজায় রাখা, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে কোনো ব্যয় না হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়া কোনো রাজনৈতিক দল যদি আয়-ব্যয়ের হিসাবে এক টাকাও ব্যয় না দেখায়, তাহলে সেই হিসাবের স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ রাজনৈতিক দল পরিচালনা, সাংগঠনিক যোগাযোগ, সভা-সমাবেশ, প্রচারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ন্যূনতম হলেও অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।’
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক অর্থায়নের তথ্য সঠিকভাবে প্রকাশ ও যাচাই করা গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘শূন্য ব্যয়’ দেখানোর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।’
বেশি ব্যয় জামায়াতের ইসির প্রকাশ করা তালিকা অনুযায়ী, নির্বাচনে মোট ৫০টি দল প্রার্থী দিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ব্যয় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, যার পরিমাণ ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা। ব্যয় দেখানো ২২টি দল বিএনপি ২৮৮ আসনে প্রার্থী দিয়ে ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা।
আরও পড়ুন: আয়-ব্যয়ে সব দলকে ছাপিয়ে জামায়াত!
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৪ জন প্রার্থী দিয়ে ব্যয় করেছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা। জাতীয় পার্টি (জেপি) ১০ জন প্রার্থী দিয়ে ব্যয় করেছে ১৮ হাজার ৮৭৫ টাকা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৬৫ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৩ টাকা। গণতন্ত্রী পার্টি একজন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১ লাখ টাকা। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ১৯২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ২৬ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৩৯ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ১৯ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১ লাখ ৪০ হাজার ১৫০ টাকা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭১ টাকা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২৬ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১ লাখ টাকা। খেলাফত মজলিসের একটি অংশ ৩৪ জন এবং আরেক অংশ ২১ জন প্রার্থী দিয়েছিল। ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) ৬ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৩ হাজার টাকা। বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) ১৯ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ২ লাখ ২৭ হাজার ১৫২ টাকা। বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) ১১ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ২ লাখ টাকা। আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩০ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭১০ টাকা। গণঅধিকার পরিষদ ৯০ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ২৯ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ১ লাখ ৯ হাজার টাকা। আমজনতার দল ১৫ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ৪২ হাজার ৫২০ টাকা। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২৮ জন প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির ব্যয় ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা।
শূন্য ব্যয় দেখানো ২৮টি দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ১২ জন, জাকের পার্টি ৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৮ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১২ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ২৩ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ৪ জন, গণফোরাম ১৯ জন, গণফ্রন্ট ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) একজন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ৫ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১২ জন, ইসলামী ঐক্যজোট ১২ জন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) একজন, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ৭ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ৮ জন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ৮ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮ জন প্রার্থী দিয়েছিল। এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৪২ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) ১৯ জন, নাগরিক ঐক্য ১১ জন, গণসংহতি আন্দোলন ১৭ জন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২ জন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি ৮ জন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ১৫ জন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) ১২ জন, জনতার দল ১৯ জন, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি) একজন প্রার্থী দিয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিও (বিজেপি) শূন্য হিসাব দিয়েছে। যদিও নির্ধারিত সময়ের পর আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া তা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এসব দল নির্বাচন কমিশনে দেওয়া জমা হিসাবে দলীয় নির্বাচনী ব্যয় ‘শূন্য’ দেখিয়েছে।
এমএইচএইচ/এমআর




