পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপিসহ বিরোধী প্রায় সব দলই শেখ হাসিনার আশ্বাসে সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে নির্বাচনের আগের রাতেই সারাদেশে পুলিশ ও প্রশাসন মিলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করে দেয়। মাত্র সাতটি আসনে জয় পায় বিএনপিসহ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই ২০১৮ সালের সেই ‘রাতের ভোটের’ বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। সেই নির্বাচনে প্রশাসনের যারা সহযোগিতা করেছিল তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জোরালোভাবে উঠছে। এর মধ্যেই ওই নির্বাচন নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। তিনি বলেছেন, ওই নির্বাচনে কর্মকর্তা পর্যায়ে বাড়াবাড়ি হয়েছিল। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে হতাশ ছিলেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (১৩ জুলাই) সাংবাদিক শারমিন চৌধুরীর ‘পালস অব পলিটিক্স’ নামক টকশোতে অংশ নিয়ে ড. আহমেদ কায়কাউস এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ২০১৮ সালের নির্বাচন, প্রশাসনের ভূমিকা, বিদ্যুৎ খাতে টেন্ডারবিহীন প্রকল্প এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
২০১৮ সালের নির্বাচন পুলিশ এবং প্রশাসন করে দিয়েছিল- এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কায়কাউস বলেন, ‘বাড়াবাড়ি হয়েছিল, বিশেষ করে কিছু কর্মকর্তা পর্যায়ে।’
শেখ হাসিনা নিজেও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন ভোটের কারণে তার রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন উল্লেখ করলে জবাবে কায়কাউস বলেন, শেখ হাসিনা তাকেও একই কথা ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন।
সাবেক এই মুখ্য সচিব বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) নিজে আমাকে বলেছেন। তিনি খুবই হতাশ ছিলেন। সিনিয়র আমলা, সচিব, মন্ত্রীসহ সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর একটা বড় চাপ তৈরি হয়েছিল।’
নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক মুখ্য সচিব বলেন, ফলাফল প্রকাশের পর সেটি বিশ্লেষণের চেয়ে সবাই ফল মেনে নেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ফলাফল যেহেতু এসে গেছে, তখন ফলাফল বিশ্লেষণ করার চেয়ে সেই ফল মেনে নেওয়ার দিকেই সবাই বেশি মনোযোগ দিয়েছিল।’
এ সময় সাবেক এই আমলা জানান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামও প্রশাসনের অতি উৎসাহী মনোভাবে বিরক্ত ছিলেন। মাঠ পর্যায়ের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তার কারণেই সেই নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়েছিল বলে জানান কায়কাউস।
আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ খাতে টেন্ডারবিহীন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হন কায়কাউস। তিনি বলেন, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন থেকেই সে সময় বিকল্প পদ্ধতিতে প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, ৮২টি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (আইপিপি) এবং ৩২টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র টেন্ডার ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে তার দাবি, কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে করা হয়নি।
যদিও একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যে ঠিক বুঝছি, তার গ্যারান্টি কী? আমি হয়তো সৎ উদ্দেশ্যেই কিছু করছি। কিন্তু আমি যে সঠিক, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সে কারণেই নির্বাচন হোক বা টেন্ডার, সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকা দরকার।’
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠভাজন এই আমলার দেশ ছাড়ার গুঞ্জন প্রসঙ্গে উপস্থাপক প্রশ্ন করেন। তবে ড. আহমেদ কায়কাউস তা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘পালানোর তো প্রশ্নই আসে না। পালানোর হলে তো আগেই যেতাম।’
এমএইচ/জেবি




