সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

নেতৃত্ব সংকটে দ্বিধাবিভক্ত জাপা, চলছে নীরব ভাঙন

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

নেতৃত্ব সংকটে দ্বিধাবিভক্ত জাপা, চলছে নীরব ভাঙন
জাতীয় পার্টির (জাপা)। ছবি: সংগৃহীত
  • দলটি এখন দুই ভাগে বিভক্ত
  • উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি নেই
  • নীরবে দল ছাড়ছেন অনেক নেতা-কর্মী
  • আওয়ামী লীগের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল জাপা

রংপুরে ভেঙে পড়েছে দলটির শক্ত ঘাঁটিগণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে দীর্ঘদিন সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির (জাপা) ওপরও। বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। নেই উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি। মাঝেমধ্যে দলীয় বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হলেও তা রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থায়ী কোনো আলোচনার জন্ম দিতে পারছে না।


বিজ্ঞাপন


বর্তমানে জাতীয় পার্টি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। দুই পক্ষের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে মাঠপর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময় দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত দলটি দিন দিন ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে।

রংপুরকে দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। স্থানীয়ভাবে এমন কথাও প্রচলিত ছিল যে, সেখানে কলাগাছকেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী করা হলে সেটিও নির্বাচিত হবে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। দলটির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরে এবার বড় ধাক্কা খেয়েছে জাতীয় পার্টি। জেলার অধিকাংশ আসনেই দলটি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি।

আরও পড়ুন: এক শতাংশ ভোটও পায়নি জাতীয় পার্টি!

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে রংপুরে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও দলটির প্রাপ্ত ভোট ছিল হতাশাজনক। এমনকি দলীয় চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের এলাকাগুলোতেও জাতীয় পার্টি জয় পায়নি। ফলে আগামী দিনে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


বিজ্ঞাপন


একসময় জাতীয় পার্টি ছিল দেশের অন্যতম সংগঠিত রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবিত থাকাকালে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ছিল দৃশ্যমান। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে জাতীয় পার্টিকে অনেকেই ‘পোষ্য বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিরোধী দলের আসনে থাকলেও সরকারবিরোধী আন্দোলন, প্রতিবাদ কিংবা সমালোচনায় দলটিকে খুব কমই দেখা গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ কখনোই জাতীয় পার্টিকে কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে গ্রহণ করেনি।

এরশাদের মৃত্যুর পর দলটিতে নেতৃত্বসংকট প্রকট হয়ে ওঠে। দলের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—গোলাম মোহাম্মদ কাদের নাকি রওশন এরশাদের হাতে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে। সময়ের সঙ্গে সেই দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয়। একপর্যায়ে দলটি কয়েকটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। কখনো রওশন এরশাদ, আবার কখনো জি এম কাদের নিজেদের বৈধ নেতৃত্বের দাবি করেছেন। এসব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

japa

শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর জাতীয় পার্টির অনেক নেতাও আত্মগোপনে চলে যান। কয়েক মাস পর তাঁরা প্রকাশ্যে এলেও দলীয় কার্যক্রমে গতি ফেরেনি। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় পার্টি ক্রমেই আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

এরশাদের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিলেও জাতীয় পার্টি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলটির প্রার্থীরা হতাশাজনক ফল করেছেন। বিশেষ করে রংপুরে কোনো আসন না পাওয়াকে দলটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নেতারা ভিড়ছেন বিভিন্ন দলে

শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়া দলগুলোর একটি জাতীয় পার্টি। জাতীয় রাজনীতির মূল আলোচনার বাইরে চলে যাওয়ায় দলটির অনেক নেতা-কর্মী ইতোমধ্যে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন বা যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ পদও পেয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুনের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর বিভাগীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। তবে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেননি।

কথা হয় জাতীয় পার্টির এক সাবেক নেতার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দলটির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কখনো যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। কয়েকবার মনোনয়ন চাইলেও তা পাননি। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকার পরও দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে জায়গা হয়নি তাঁর।

আরও পড়ুন: ফের চাপে জাপা, জোরালো হচ্ছে নিষিদ্ধের দাবি

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রওশন এরশাদপন্থীরা, অন্যদিকে জি এম কাদেরপন্থীরা। দলকে এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচি বা পরিকল্পনা নেই। ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।’

তার মতে, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের অস্পষ্টতার কারণে দলটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

japa

দলটির একাধিক নেতা জানান, গত কয়েক বছরে যারা জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পাননি বা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, তাঁদের অনেকে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়িয়েছেন। একসময় জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক নেতাকেও এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নিষ্ক্রিয় দেখা যাচ্ছে।
তাঁদের একজন বলেন, ‘দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও আমরা অনেকেই মূল্যায়ন পাইনি। ফলে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছি। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই সময় কাটছে।’

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী মনে করেন, জাতীয় পার্টির বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির উত্থান হয়েছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায়। এরশাদের পতনের পরও দলটি একসময় জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এবং বিরোধী দলের ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে না পারায় জনসমর্থন কমতে থাকে।’

ড. নুরুল আমিনের মতে, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় পার্টির জন্য বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, যেখানে দলটির শক্তিশালী ভিত্তি ছিল, সেখানেও তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি।

তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের বিকাশ সাধারণত নির্বাচন ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঘটে। কিন্তু জাতীয় পার্টি নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছে না, আবার রাজপথের আন্দোলনেও তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নেই। একই সঙ্গে সাংগঠনিক বিভক্তিও বাড়ছে। ফলে দলটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।’

আরও পড়ুন: না পাওয়ার বেদনা নিয়ে দল ছাড়লেন জাপা মহাসচিব

জাতীয় পার্টি ভবিষ্যতে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাব হারাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো দল পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। জাতীয় পার্টিও হয়তো কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকবে। তবে অতীতে যেভাবে তারা সংসদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেত, সেই অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেক কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে নিজেদের ঐতিহ্যগত অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় পার্টি। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও তাদের জনসমর্থন আগের তুলনায় অনেক কমেছে। ফলে আগামী দিনে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া।’

এমআইকে/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর