# প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, স্থবির সাংগঠনিক কার্যক্রম
# শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ বিদেশে বা আত্মগোপনে
বিজ্ঞাপন
# মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম না থাকায় হতাশ তৃণমূল
# অনলাইন নির্ভর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সীমিত উপস্থিতি
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ পরিচালনা করা দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য রাজনীতি করতে না পারায় দলটি এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটির ভবিষ্যৎ কোন পথে গড়াবে-তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে।
চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতার হারানোর পর দলটির প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির বহু শীর্ষ নেতা বিদেশে পালিয়ে যান। যারা পালাতে পারেননি তারা দেশেই আত্মগোপনে থাকেন। ৫ আগস্টের পর দেশে থাকা অনেক নেতা গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি আছেন। আর যারা বাইরে আছেন তাদের অনেকে এখনো গা ঢাকা দিয়ে আছেন। যারা এলাকায় আছেন তারাও অনেকটা কোণঠাসা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রকাশ্য সমাবেশ না থাকায় সংগঠনের গতিও কমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বেশ কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে ঈদ আনন্দ নেই। ঘরবাড়ি ছাড়া হওয়া অনেক নেতা এখনো বাড়ি যেতে পারছেন না। ফলে গত তিন ঈদ হতাশায় কেটেছে। এবারেও ঈদুল আজহাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। ছন্নছাড়া অবস্থায় দিনাতিপাত করা দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে এবারো বাড়ি যেতে পারেননি।
আওয়ামী লীগের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এই সরকারের সময়েই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী দেড় বছরে নানা চেষ্টা সত্ত্বেও দলটি সংগঠিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এমনকী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দলটির নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। দলটি আশা করেছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে। এজন্য আওয়ামী লীগের অনেক বিএনপিকে ভোট দিয়েছে বলে লোকমুখে প্রচার আছে।
বিএনপি সরকারের আসার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই। বিএনপির তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগকে ছাড় না দেওয়ার অনড় অবস্থানে আছে বিএনপি। বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে দেশের রাজনীতিতে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায় সেই চেষ্টা করলেও সুবিধা করতে পারছেন না। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত ১৭ এপ্রিল শেখ হাসিনার এক সময়ের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ঘিরে দেশের কিছু এলাকায় দৌড়ে দৌড়ে মিছিল করেছিল আওয়ামী লীগের গুটিকয়েক নেতাকর্মী। এছাড়া দলটির তেমন কোনো তৎপরতা মাঠে দেখা যায়নি। তবে সামাজিক মাধ্যমে অনেককে দলের হয়ে স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে। এতে হতাশ হয়ে ঝিমিয়ে পড়ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
গুজব ছড়ানোর অভিযোগ
দলটির প্রধান ফেসবুক পেজে ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বার্তা দেখা যায়নি। এর পরিবর্তে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট প্রকাশ করতে দেখা যায়।
তবে এসব সমালোচনার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এ কাজে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েক হাজার কর্মী যুক্ত আছে বলে তথ্য পেয়েছে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংগঠিতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
তিতুমীর কলেজের ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী গত দুই বছর ধরেই এমন কাজ করছেন। তাদের একজন বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ফেসবুকে পড়ে থাকি। আমাদের কাজই হলো শেখ হাসিনা, শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড ও প্রকল্প নিয়ে যারা সমালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করা, ভিডিও তৈরি করা, পোস্ট করা। এসব করলে আমরা প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার করে টাকা পাই। তাতে সংসার ও হাত খরচও হয়। তবে কেউ প্রকাশ্যে আমরা এসব করি না। ভুয়া আইডি ও গ্রুপ দিয়েই এসব করা হচ্ছে।’
অনলাইন মিটিং করে চলছে রাজনৈতিক তৎপরতা
নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দলটির পলাতক নেতাকর্মীদের অনেকে অনলাইনে সক্রিয় আছেন। ভারত, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, লন্ডন ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা দেশে থাকা কর্মীদের সঙ্গে জুম মিটিং করছেন বলে জানা গেছে।
১৭ এপ্রিল শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিবস ঘিরে ঢাকা-১৩ আসন মোহাম্মপুরের নেতাকর্মীদের ২০ জন অনলাইন মিটিং করেছেন। তারা ১৬ এপ্রিল অনলাইন জুম মিটিংয়ে যুক্ত হয়ে কোথায় কোথায় মিছিল করবে, কারা নেতৃত্ব দেবে তা ঠিক করেন। নির্দেশনা দেন ৩৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। অন্যদিকে একই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদও একই কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তাদের অনলাইন মিটিংয়ে কখনো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল যুক্ত হন বলে জানায় দলটির একাধিক নেতাকর্মী।
তৃণমূলে হতাশা
দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেজগাঁও এলাকার সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (আসাদুজ্জামান খান) বড় বড় কথা বলতেন। আজ তিনি ভারতে পালিয়ে অনলাইনে কথাও বলতে চান না। আজ নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারছেন না।’
প্রকাশ্যে আসছেন না পলাতকরাও
গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া কাউকে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। অনেক নেতা বিদেশে অবস্থান করলেও সেখানেও তারা আর প্রকাশ্যে আসেন না। তবে চলতি বছর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বাকিদের খোঁজ মিলছে না।
হাসিনা কি আসলেই ১৫ আগস্ট ফিরছে!
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি একটি দাবি ছড়িয়েছে যে চলতি বছরের ১৫ আগস্ট ভারত থেকে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। কিছু পোস্টে বলা হচ্ছে, তিনি ‘শক্তি নিয়ে ফিরে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন’ এবং দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নেবেন।
আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু অ্যাকাউন্টে এমন দাবি প্রচার করা হলেও বিপরীতে বিপক্ষ দল বিদ্রূপ ও কার্টুনভিত্তিক পোস্ট ছড়াচ্ছে। বিদ্রূপ করে অনেকে পোস্ট দিচ্ছেন কবে ফিরবেন আপনাদের আফা! এই বছর নাকি সামনে বছর?
কোন পথে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ?
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ এখন অভিভাবকহীন। গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির কেন্দ্রীয় দুই কার্যালয়ে ভাঙচুরের পর আগুন দেওয়া হলেও কোনো প্রতিবাদ হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়ি ভাঙচুরের সময়ও দলেও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে পোস্ট দিতে দেখা গেলেও মাঠে দেখা নেই কারও। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে আগামীতে মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ কোন দিকে যাবে?
আরও পড়ুন: রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত করছে এনসিপি
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া বা বক্তব্য দেওয়া কঠিন। কেউ কি মনে করেছে চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে চলে যাবে? যারা আজকে সকল রাজনৈতিক দল ইনক্লুডিং বিএনপি মনে করেছিল আওয়ামী লীগকে সরানো কঠিন হয়ে পড়বে, তো সেই ক্ষেত্রে ভিন্ন বিশ্লেষণ আসে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে। কিন্তু আমরা যদি শাসন কনস্টিটিউশনালি চিন্তাভাবনা করি তাহলে এখানে দেখা যাবে আওয়ামী লীগের একটা ভোট ব্যাংক আছে। এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আওয়ামী ১৫ বছরের যে কার্যকলাপ করেছে সেইখানে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
আওয়ামী লীগ আদৌ রাজনীতি করার সুযোগ পাবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ব্যাপারী বলেন, ৫ আগস্টের পতনের সময়টা তারা পুরো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং এই সময় আন্দোলনে তারা যে লোকগুলোকে হত্যা করেছে, এর আগেও ১৪/১৫ বছরে খুন গুম হত্যা করেছে, সেই বিচারগুলো কিন্তু এই বর্তমান সরকারে করা উচিত। বিচার করার পর সিদ্ধান্ত হবে কারা এই অপরাধ করেছে বা কারা অপরাধী না। এরপর তাদের রাজনীতি করার সুযোগ সুবিধা দেবেন কিনা সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হলে শুধু বিএনপি একা নয়, জামায়াতে ইসলামী এনসিপিসহ অন্যান্য পার্টির সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আলোচনা করে তারপর একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। হঠাৎ করে যেটা মনে করেন বিএনপি যদি বলে যে আওয়ামী লীগের সুযোগ দেওয়া হবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের, তাহলে কিন্তু অন্যান্য পার্টিগুলো দেখবেন তারা অরাজগতা সৃষ্টি করবে বাংলাদেশে। সেই ক্ষেত্রে আমার মনে হচ্ছে যে, ইলেকশনটা এটা গিয়েছে নেক্সট ইলেকশনের আগে হয়তো বা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটা পজিটিভ সিদ্ধান্ত উপনীত হতে পারবে সরকার।’
এমআইকে/এমআর




