গত শুক্রবার (২২ মে) ঝিনাইদহে জুমার নামাজের পর ছাত্রদলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সেখানে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মুখে ডিম নিক্ষেপ করা হয় এবং সংঘর্ষে দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন।
ওই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা করে ছাত্রদল ও এনসিপি। মামলার পর গ্রেফতার হন এনসিপির দুই নেতা। তার মধ্যে একজন সোমবার (২৫ মে) জামিন পেয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তারা আগাম জামিন নিয়ে রেখেছেন।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু সেদিন কীভাবে কী ঘটেছিল?
সোমবার (২৫ মে) বিকেলে এ বিষয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে একটি লম্বা পোস্ট দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সেখানে তুলে ধরেছেন ঝিনাইদহের ঘটনার বিস্তারিত।
ঢাকা মেইল পাঠকদের জন্য পাটওয়ারীর সেই পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
বিজ্ঞাপন
ফিরে আসা মৃত্যুর মুখ থেকে:
ঝিনাইদহে যাওয়ার আগেই কসবা, হাতিবান্ধা ও রাজশাহীর সফর ছিল পূর্বনির্ধারিত। কসবা ও হাতিবান্ধা সফরে সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ উঠে এসেছে। যা দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো আইনেই বৈধতা নেই, এটি সম্পূর্ণ অনিয়মিত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা।
একজন ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, যা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি নাই এবং মানার কথাও না। কিছু করতে পারি বা না পারি, তাদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করা, তাদের কথা শোনা এবং সত্য ঘটনা জানা আমার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব, যা আমি কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারি না।
এর মাঝে ছিল রাজশাহীর ১১ দলীয় সমাবেশ, যা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও বিচারের দাবিতে অনুষ্ঠিত হয়। আমি এনসিপির পক্ষ থেকে ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ দায়িত্বে থাকায় শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও দায়িত্বের জায়গা থেকে সেখানে ছুটে যাই।
আমার মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হঠাৎ জনদাবির কারণে আমি বক্তব্য দিতে শুরু করি। সেখানে আমি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করাকে ভণ্ডামি ও প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করি এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে।
এরপর ঢাকায় এসে আবার হাতিবান্ধার উদ্দেশ্যে সফর শুরু করি। সেখানে মানুষের সাথে কথা বলে সত্য ঘটনা উন্মোচনের চেষ্টা করি, যা অনেকের ভদ্রবেশী ছদ্মবেশ উন্মোচন করে দেয়।
এরপর আসে শুক্রবার। আমি এক জুমা এক মসজিদে আদায় করি। নামাজের পর মানুষের সাথে কথা বলি, আড্ডা দেই। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম অর্থনৈতিক কাঠামোর উৎসগুলো যাতে জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা করা।
ঝিনাইদহের প্রয়াত আলেম ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের (রহ.) লেখা ও চিন্তাভাবনা আমি দীর্ঘদিন ধরে পড়েছি। তিনি এখন দুনিয়ায় নেই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসীব করুন। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা প্রস্তাব দেন ঝিনাইদহে যাওয়ার-জুমা পড়া, স্যারের কবর জিয়ারত করা এবং আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট পরিদর্শন করা।
স্যারের কবর জিয়ারতের সময় নির্ধারিত ছিল ১২:২০। তার ছেলে সকাল থেকে আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু জ্যাম, রাস্তার বেহাল অবস্থা এবং গ্যাসের সিরিয়াল, সব মিলিয়ে আমরা পৌঁছাই ১:৩০-এ।
ঝিনাইদহ কোর্ট জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। প্রথম রাকাতে রুকুতে এসে নামাজে শরিক হই। স্থান সংকুলান না হওয়ায় কিছু অংশ মসজিদের বাইরে নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে সুন্নত পড়ার জন্য আবার মসজিদের ভিতরে যাই। এরপর বের হয়ে দেখি হাজারখানেক মানুষ দাঁড়িয়ে সালাম দিচ্ছে। আমিও সবার সালামের উত্তর দিই। ছবি তোলা শেষ করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা হই।
আমার সাথে ছাত্রশক্তি, যুব শক্তি এবং এনসিপির প্রায় ৪০/৪৫ জন লোক ছিল। মসজিদের কম্পাউন্ডে ইবির ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আমাকে এসে হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করে। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।
এরপর হঠাৎ করে চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করি। পাশ থেকে জানানো হয় আমার চোখে ডিম মারা হয়েছে। এরপর পাশ থেকে একজন জোরে ধাক্কা দেয়, একজন ঘুষি মারে, আমার মাথা ভো ভো করতে থাকে। আমাদের সহযোদ্ধারা ব্যারিকেড তৈরি করে আমাকে রক্ষা করে। এর মাঝে কয়েকজনের মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে।
হঠাৎ দেখি বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুড়ছে আমাদের দিকে। এরপর শুরু হয় হকিস্টিক দিয়ে আঘাত। আমি উঠে দাঁড়াই এবং প্রতিরোধের ডাক দেই। কয়েকজনকে ধরে তাদের কাছ থেকে হকিস্টিক ও স্টিক উদ্ধার করতে সক্ষম হই, যা পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুলভাবে প্রচার করা হয়।
যে দিক থেকে ইট-পাটকেল ও হকিস্টিকের আঘাত আসছিল, সেই দিক থেকেই পুলিশও তাদের সাথে অংশগ্রহণ করে বলে আমরা অনুভব করি। ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি এবং পুলিশের উপস্থিতি একসাথে দেখে আমরা পরিস্থিতিকে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করি এবং হোটেলের সামনে অবস্থান নেই।
এর মাঝে সাধারণ জনগণ এগিয়ে আসে এবং আমাদের রক্ষা করে। আমি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই। বিকালে এনসিপিতে ৩০০ জনের যোগদান অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং আমাদের উপর হামলার বিচারের জন্য থানার উদ্দেশে রওনা দেই।
থানায় পৌঁছানোর পর পুলিশ জানায় বিকালের অনুষ্ঠান করা যাবে না এবং কমিউনিটি সেন্টার সিলগালা করে দেয়। আমরা আমাদের নিরাপত্তা দাবি করি। তারা অপারগতা জানায় এবং বলে ঝিনাইদহ ছেড়ে চলে যেতে। আমি বলি আমাদের উপর হামলার ঘটনায় মামলা করতে চাই। তারা বলে এজহার রেডি করতে। আমি এজহার রেডি করি।
এরপর হঠাৎ ঝিনাইদহ সদর থানার বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারা বলে বিদ্যুৎ নেই, আপনারা চলে যান পরে মামলা হবে। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, থানার বাইরে সব জায়গায় বিদ্যুৎ আছে। এতে সন্দেহ হয়। আমি বলি, মামলা নাম্বার এবং অনলাইনে এন্ট্রি করে হলে আমি যাবো।
এরপর তারা বলে সার্ভার ডাউন। আমি বলি সার্ভার সচল হলে মামলা করে যাবো। প্রায় ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করি, কিন্তু মামলা নেওয়া হয় না। এর মধ্যে আমি ফেসবুকে পোস্ট দেই। তখন ওসি ও এএসপি থানা থেকে সরে যায়। আমি ঘোষণা দেই থানার সামনে অবস্থান করবো।
পরে জানানো হয় মামলা নেওয়া হবে, তবে কিছু নাম বাদ দিতে হবে। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ায়, যাকে মূল পরিকল্পনাকারী বলা হচ্ছিল, তখনই তারা মামলা নিতে রাজি হয়। ঢাকা থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের ফোন আসে, তারা বলে মামলা হবে, আপনারা চলে আসেন। কিন্তু আমার মনে হয় মামলা হবে না, তাই আমি অবস্থান জোরালো করি।
হঠাৎ ওসি ও এএসপি উপস্থিত হয়। তারা উপর থেকে নির্দেশ পায় মামলা নিতে। ৮ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে এবং তারা মামলা নেয়। মামলা নেওয়ার পর আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।
থানা থেকে বের হওয়ার আগেই লাঠিসোটা নিয়ে প্রায় তিন হাজার লোক থানার সামনে উপস্থিত হয়। তারা গেট ভাঙতে শুরু করে। থানার ভেতরে থাকা পুলিশ পালাতে শুরু করে। আমি কালেমা পড়ে এবং ফেসবুকে ‘please save us’ পোস্ট দিয়ে মরণের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করি।
এরপর ওসি ও এএসপি জানায়, সেই প্রভাবশালী নেতার নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এটি বলার পর তারা থানার গেট ভাঙা বন্ধ করে। ওসি ও এএসপি জানায়, ৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের বের হতে হবে। তারা আমাদের গাড়িতে তুলে দেয় এবং ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়ে দেয়।
লাঠিয়াল বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেন আলাদা মামলা দেয়। এরপরই তারা পরবর্তী পরিকল্পনার জন্য প্রস্তুতি নেয়। এর মাঝেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অয়ন গ্রেফতার হয় এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা গ্রেফতার হয়। ঝিনাইদহে বাসায় বাসায় গিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।
আমরা যদি কখনো মারা যাই, আমাদের খুনের বিচারটা যেন করা হয়, এইটুকুই অনুরোধ। হাদী ভাইয়ের বিচার হয়নি। তাই আশা কম, কিন্তু আল্লাহ আছেন। কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ যেন সব অন্যায়কারীর বিচার করেন—এই দোয়া ছাড়া এই মজলুমের আর কিছু বলার নেই।
‘আরও বিস্তারিত ভিডিওতে আসবে’ বলে ফেসবুক পোস্টের সবশেষে জানান এনসিপি নেতা ও জুলাই বিপ্লবী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এএইচ



