নির্বাচনী আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের একটি আসন হারাতে পারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এ জোটের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য এনসিপির মনোনীত এক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে আসনটি পরবর্তীতে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা বেশি থাকায় আসনটি বিএনপির ঝুলিতে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র জোট একটি আসন পেয়েছে। এভাবে মোট ৫০টি আসন বণ্টন করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএনপি থেকে ৩৬ জন, জামায়াত জোট থেকে ১৩ জন এবং স্বতন্ত্র জোট থেকে একজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের পর তিন বছর অতিবাহিত না হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ২০০৪ সালের আইনের অধীনে আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন। ওই আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, এ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিধিমালার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও)-এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা প্রযোজ্য হবে। সেখানে প্রার্থীর অযোগ্যতা প্রসঙ্গে আরপিওর ১২ (১) (চ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হবেন, যদি তিনি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসর গ্রহণের পর তিন বছর অতিবাহিত না করেন।
জানা গেছে, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে যোগ দেন ২০২৩ সালের নভেম্বরে এবং পদত্যাগ করেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। এ হিসেবে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী পদত্যাগের পর তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আরপিওর ১২ ধারার বিধান অনুযায়ী মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল হতে পারে। তবে তাঁর মনোনয়ন স্থগিত রেখে আগামীকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর জামায়াত জোটের হয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। তা গ্রহণ করা হলেও রিসিভ কপিতে ১৯ মিনিট বিলম্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ১১ দলীয় জোট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৩টি আসনের জন্য ১৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রই দাখিল করেছে। সময়সীমা শেষে নতুন করে মনোনয়ন গ্রহণের বিধান নেই। এ ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ এলে ভিন্ন বিষয় হতে পারে। তবে আসনটির জন্য নতুন তফসিল ঘোষণা করা হলে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা বেশি থাকায় তারা প্রার্থী দিলে আসনটি তাদের ঝুলিতে যেতে পারে। প্রার্থী না দিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
বিজ্ঞাপন
এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিন সরকারি চাকরি থেকে অবসরের তিন বছর পূর্ণ না হলে প্রার্থী হতে পারবেন না—এমন আলোচনার বিষয়ে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এ কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হবে না বলে তারা আশা করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরা শারমিন বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং এটি সেকেন্ড ক্লাস পদ, যা রাষ্ট্রের কোনো লাভজনক পদ নয়। বিষয়টি নির্বাচন কমিশন অবগত আছে, আর আইনি বিষয়গুলো তাঁদের আইনজীবীরা দেখবেন।
কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে এবং সংশ্লিষ্ট জোট বা দলের আর কোনো প্রার্থী না থাকলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, যাচাই-বাছাইয়ে প্রার্থিতা বাতিল হলে আসনটি উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এরপর নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে উন্মুক্ত আসনে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দীন খান বলেন, ডকুমেন্ট দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে।
বিধি ও আইন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এ যেভাবে বলা আছে, এখানেও সেটিই প্রযোজ্য।
এদিকে আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ১১ দলীয় জোটের ১২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় প্রার্থী মনিরা শারমিনকে উদ্দেশ করে বলা হয়, তিনি আগামীকাল দুপুর ১২টার মধ্যে কাগজপত্র জমা দেবেন, এরপর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আরও পড়ুন: সংরক্ষিত নারী আসন: জামায়াত জোটের ১২ মনোনয়ন বৈধ, ১ জনের স্থগিত
যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে: জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, প্রচার ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলু, কেন্দ্রীয় ইউনিট সদস্য ও সিলেট মহানগরের সাবেক সেক্রেটারি অধ্যাপক মাহফুজা হান্নান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য সাজেদা সামাদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সেক্রেটারি শামছুন্নাহার বেগম, নারী অধিকার আন্দোলনের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিম।
অন্যদিকে, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাছাই স্থগিত রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হবে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল), আপিল ২৬ এপ্রিল, আপিল নিষ্পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।
জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবেন।
এমএইচএইচ/এআর




