ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ও তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ সুযোগ রেখে যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, সেটিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করেছে বিএনপি সরকার।
গত বছরের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
বিজ্ঞাপন
এখন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে পাস করায় সেটিতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর করার পর গেজেটের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হবে।
ফলে বিএনপির দীর্ঘকালের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থেকেই গেল এবং বিলটি সংসদে পাসের পর আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে এর সমালোচনা করে ‘দায়’ বিএনপিকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সত্যিই কি রাজনৈতিক দল কিংবা দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দায় বিএনপি নিজেই কাঁধে তুলে নিল? কেনই বা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বহাল রাখল দলটি?
বিজ্ঞাপন
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলছেন, ‘বিএনপি বিলটি পাস করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। তার মতে, ‘আওয়ামী লীগকে যদি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তো দুনিয়ার সব স্বৈরশাসককেই সম্মান করতে হবে।’
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক অবশ্য বলছেন, ‘বিএনপির এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও একই কায়দায় দল বা দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলছেন, সরকার যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এতে ‘দায়’-এর কোনো প্রশ্নই নেই বলে মনে করেন তিনি।
কিন্তু সরকার কি নতুন কিছু যোগ করেছে?
বিলে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে।’
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসসক্ষে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করবে।’
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন বিল, ২০২৬’-এ সরকার নতুন করে কিছু যোগ করেনি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশটিই শুধুমাত্র নিয়মানুযায়ী সংসদ অনুমোদন করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
বিলটি পাসের সময় সংসদে এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার দাবি করেছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ তিনি পাননি।

তবে তার প্রস্তাবের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিলটি হলো একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে আইন ছিল সেটা সংশোধনের জন্য। ওনারা (জামায়াত) ও এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটা আন্দোলন করেছিলেন। সে প্রেক্ষিতে মোটামুটি একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে তাদের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হয়ে আছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টে সংগঠনটির বিচারের জন্য সে আইনও সংশোধন করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছিল। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
আরও পড়ুন: বাতিল হলো ‘শেখ পরিবারের নিরাপত্তা আইন’
যদিও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ পেতে পারে- দলটির অনেকেই এমন আশা করছিলেন। এমনকি গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন-এমন প্রচারও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বিশ্লেষকরাও অনেকে দলীয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলে আসছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তিনি বিচারের মাধ্যমে শাস্তি পেতে পারেন। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিরুদ্ধে মামলার রায়ও হয়েছে। দলটির বহু নেতাকর্মী কারগারে আটক আছেন।

তবে এখন বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাসের পর এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে, ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার কারণে বিএনপি একসময় নিজেই আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করতো। এখন বিএনপি নিজেই একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার দায় কাঁধে নিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
অনেকে মনে করেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি ‘রাজনৈতিকভাবে একটি নির্ঝঞ্ঝাট পরিস্থিতি’ উপভোগ করছে। আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে ফিরে না এলে বিএনপির সামনে ‘শক্তিশালী কোনো বিরোধী পক্ষও থাকল না’ বলে মনে করেন তারা।
আবার কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ বিরোধী জনমত এখন তীব্র এবং এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে বিএনপি সরকার কোনা ছাড় দিলে তাকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট পরিস্থিতি জটিল করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে- এই বিবেচনাতেই আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে চাইছে বিএনপি।
অন্যদিকে এমন ধারণাও আছে যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তৃণমূলের ভোটের হিসেব বিবেচনায় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরলে সেটি বিএনপির জন্য সুবিধাজনক নাও হতে পারে।

যদিও অনেকে এমনও মনে করেন যে, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি বোঝাপড়া আছে এবং উভয়পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান আরও সংহত করার জন্যই দলটিকে এখন আপাতত রাজনীতির সুযোগ দিতে রাজি নয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী অবশ্য বলছেন, সরকার শুধুমাত্র পাবলিক সেন্টিমেন্টকেই বিবেচনায় নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখনো রক্তের দাগ শুকায়নি। এ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্তর্র্বতী সরকারের যে সিদ্ধান্ত ছিল সেটি বহাল রাখাই যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। এখনই যদি আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক ভাবে থাকে, তাহলে তো দুনিয়ার সব নিষ্ঠুর স্বৈরশাসককেই সম্মানিত করতে হবে। এখানে তাদের বিরুদ্ধে মানুষের এখনো তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সরকার সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন, বিএনপি বিলটি পাস করে আওয়ামী লীগ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং তারা না চাইলে বিলটি পাস হতো না।
তিনি বলেন, ‘একটা দলের নেতা কর্মী বা সাধারণ সদস্যরা অপরাধ করতে পারে। তার বিচারও হতে পারে। কিন্তু তার জন্য দল বা দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বহাল রেখে বিএনপি সরকার ভবিষ্যতেও অনেক দল নিষিদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল।’
তার মতে, ‘আওয়ামী লীগের হাতে বিএনপি নির্যাতিত হয়েছে। এখন কেউ কেউ যদি মনে করে বিএনপিও প্রতিশোধমূলক বা প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না।’
যদিও অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলছেন, একটা দল যদি মানবতাবিরোধী কিংবা গণহত্যার মতো অপরাধ করে, সেই দলের রাজনীতির অধিকার কতটা থাকে?
তিনি বলেন, ‘এখানে বিএনপির দায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ যারা জনগণের অধিকার হরণ করেছে, যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটি বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে মনে করি না।’
অবশ্য মাহবুব উল্লাহ এও বলেছেন, ‘দলটি (আওয়ামী লীগ) এখন হয়তো নিষিদ্ধ থাকছে। হয়তো পরে কখনো পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতেও পারে।’ সূত্র: বিবিসি
এএইচ
