ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে নতুন সংসদের পেশাগত বিন্যাসে ব্যবসায়ী পেশাজীবীদের প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই নিজেদের প্রধান পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
গত বৃহস্পতিবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন বাতিল করা হয়। আরও দুটি আসনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় মোট ২৯৭ জন বিজয়ীর তথ্য বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
হলফনামা বিশ্লেষণে পাওয়া চিত্র
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা থেকে পেশা, মামলা, আয়, সম্পদসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে হলফনামা বাধ্যতামূলক করা হয়। এবারের নির্বাচনে ১০ ধরনের তথ্য প্রদান করা হয়েছে, যা প্রার্থীদের পেশাগত ও আর্থিক প্রোফাইল বোঝার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি দিয়েছে।
একাধিক পেশা উল্লেখের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগত সুবিধার জন্য প্রথমে লেখা পেশাকেই মূল পেশা হিসেবে ধরা হয়েছে। সেই হিসেবে ২৯৭ জন বিজয়ীর মধ্যে ১৭৪ জন ব্যবসায়ী।
সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে ব্যবসায়ী এমপিদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে ব্যবসায়ী এমপির হার ছিল ১৮ শতাংশ। ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ছিল ৬৭ শতাংশ। নতুন সংসদেও অর্ধেকের বেশি আসনে ব্যবসায়ী পেশাজীবীদের জয় সেই প্রবণতাকেই জোরালো করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের সক্রিয়তা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিসভা কেমন হতে পারে, জানালেন মেজর হাফিজ
দলভিত্তিক পেশাগত বিন্যাস
সরকার গঠন করতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবারের নির্বাচনে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে ১৪৫ জন বা ৬৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮ আসন পাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর নির্বাচিতদের মধ্যে ২০ জন বা ২৯ শতাংশ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত ছয়জন এমপির মধ্যে দুজন ব্যবসায়ী। স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী সাতজনের পাঁচজনই ব্যবসায়ী; তাঁদের অধিকাংশই পূর্বে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন।
এই পরিসংখ্যান দলগুলোর প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় পেশাগত বৈশিষ্ট্যের একটি প্রবণতা নির্দেশ করে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল খাতের প্রতিনিধিত্ব
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে অন্তত ১৫ জন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই শিল্প সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব বা সদস্যপদে যুক্ত ছিলেন।
নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন জয়ী পোশাক ব্যবসায়ীরা
পোশাক শিল্প-মালিক ও তাদের পরিবারের কমপক্ষে ১৫ জন সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। সবাই বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।
প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু ফেনী-৩ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি লুৎফর রহমান মতিন টাঙ্গাইল-৪ ও সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রাম-৮ থেকে জয় পেয়েছেন।
বিজিএমইএ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক নোয়াখালী-২, জাকির হোসেন বাবলু ময়মনসিংহ-৫ ও জাকারিয়া তাহের সুমন কুমিল্লা-৪ থেকে সংসদে যাচ্ছেন।
খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মুন্সিগঞ্জ-১, শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১ ও তৈরি পোশাক শিল্প-মালিক পরিবারের সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম ফরিদপুর-২ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
বিকেএমইএ সদস্য আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর পিরোজপুর-২ থেকে বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়া কুমিল্লা-৯ থেকে বিটিএমএর সহ-সভাপতি মো. আবুল কালাম, মানিকগঞ্জ-৩ থেকে সংগঠনের পরিচালক আফরোজা খানম রিতা, হবিগঞ্জ-৪ থেকে প্রাক্তন সহ-সভাপতি এস এম ফয়সাল ও নরসিংদী-৩ থেকে সদস্য মঞ্জুর এলাহী সংসদ সদস্য হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট শিল্পমহল আশা প্রকাশ করেছে, তারা শিল্প ও কর্মসংস্থানবান্ধব নীতিতে ভূমিকা রাখবেন।
আরও পড়ুন: ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় বিএনপি: সালাহউদ্দিন
ব্যবসায়ী পেশাজীবীদের বাড়তি উপস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের একাংশের মতে, সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নীতিনির্ধারণে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, আইন প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এনার্জি খাতের ব্যবসায়ী বশীর উল্লাহ ভূইয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশে আসলে প্রকৃত রাজনীতি নেই। ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই রাজনীতি ম্যানিপুলেট করছিল। এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতির অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যবসায়ীরা যখন আইন প্রণয়ণ করবে তখন ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথাই বেশি ভাববে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যবসা ও রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, নীতিমালা প্রণয়নে জনস্বার্থ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য, নির্বাচিতরা ব্যবসায়ী পরিচয়ে নয়, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের দাবি, শিল্প ও অর্থনীতিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিরা সংসদে থাকলে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পেশাগত বিন্যাস ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী এমপিদের শক্ত উপস্থিতি নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন সংসদের কার্যকারিতা মূল্যায়িত হবে বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
এমআর/এআর

