ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরু থেকেই বিদ্রোহ ইস্যুতে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে বিএনপি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারী অনেক প্রার্থীকে বহিষ্কারও করে দলটি। প্রার্থী ছাড়াও অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও নেয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা। স্থগিত করা হয় দলটির কিছু কমিটিও। দলের এমন কড়া অবস্থানেও শেষ পর্যন্ত ৭৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিএনপির বিদ্রোহীরা। যার প্রভাব পড়েছে ভোটের ফলাফলে। অন্তত ২৮ আসনের ফলাফলে দলটির ভোটের হিসাব-নিকাশ ‘ওলটপালট’ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ বলছে, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ৭ জন জয় পেয়েছেন। আবার বিদ্রোহী প্রার্থীতে জটিল সমীকরণে অন্তত ২১টি আসনে হেরে গেছেন বিএনপি ও দলটির জোট সঙ্গিরা। আর সেই সমীকরণে সুবিধা পেয়েছেন জামায়াত ও দলটির জোটের প্রার্থীরা। অর্থাৎ, মোট ২৮টি আসনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছেন বিএনপির বিদ্রোহীরা।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) এয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এদিন সকাল সাড়ে ৭ টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ করা হয়। পরে গণনা শেষে রাত থেকে বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয় পাওয়া আসনগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, কুমিল্লা-৭ ও চাঁদপুর-৪, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল-৩ ও কিশোরগঞ্জ-৫, রংপুর বিভাগের দিনাজপুর-৫ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ-১ উল্লেখযোগ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের প্রার্থী পান ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট। একইভাবে কুমিল্লা-৭ আসনে বিদ্রোহী আতিকুল আলম শাওন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে দলীয় প্রার্থী পান ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট।
ময়মনসিংহ-১ আসনে বিদ্রোহী মোহাম্মদ সালমান ওমর প্রায় ৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহও এক লাখের বেশি ভোট পেলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিদ্রোহী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল ৭৯ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে দলীয় প্রার্থী পান ৬৬ হাজার ১১৮ ভোট।
অন্যদিকে, বিদ্রোহীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা ৫০টি আসনে জয়লাভ করে। এরমধ্যে পটুয়াখালী-৩ আসনে জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুর প্রায় ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান।
হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-২, মানিকগঞ্জ-১ এবং রাজশাহী-৫ আসনেও দলীয় প্রার্থীরা বিদ্রোহীদের পরাজিত করে আসন ধরে রাখতে সক্ষম হন। তবে বিদ্রোহের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ২১টি আসনে, যেখানে ভোট বিভক্ত হওয়ায় জামায়াত ও তাদের জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন।
আরও পড়ুন:
ভোটের মাঠে কুপোকাত যেসব দলীয় প্রধান
নীলফামারী-৪ আসনে জামায়াতের আবদুল মুনতাকিম ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ ভোট পেয়ে জয় পান, যেখানে বিএনপি প্রার্থী পান ৮১ হাজার ৫২৬ ভোট। একইভাবে সিলেট-৫, নোয়াখালী-৬, পাবনা-৩ ও ৪, রংপুর-৩, গাইবান্ধা-৫, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২ ও ৫, নড়াইল-২, বাগেরহাটের তিনটি আসন, সাতক্ষীরা-৩, শেরপুর-১, ঢাকা-১২, মাদারীপুর-১, চট্টগ্রাম-১৬ এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনেও জামায়াত বা তাদের জোটের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন।
বিশেষ করে খুলনা বিভাগে বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিভাগে আটটি আসন হাতছাড়া হয়েছে দলটির। ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান ৭৫ হাজার ৯৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, যিনি পান ৫২ হাজার ৬৬৯ ভোট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপি একদিকে কিছু আসনে জয় পেলেও অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে পরাজয়ের মুখে পড়ে। বিশেষ করে ২১টি আসনে ভোট বিভক্ত হওয়ায় জামায়াত ও তাদের জোট সরাসরি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে।
এম/এএম

