স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করতে স্বাস্থ্যখাতে বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
'স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার'-এই নীতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপে পড়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকারি হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপত্তাহীন ও অসম্মানজনক অবস্থায় কাজ করছেন এবং মানসম্মত সেবার অভাবে মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঘোষিত পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যখাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতিটি মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পাবে, সামর্থ্যের ভিত্তিতে নয়—এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যাতে চিকিৎসা ব্যয় মানুষের দারপ্রান্তে পৌঁছাতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গেলে চিকিৎসক রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারবেন। এতে ভুল চিকিৎসা, ওষুধের পুনরাবৃত্তি ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে ইউনিটভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং শহরের ওয়ার্ডভিত্তিক ইউনিট স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নারীস্বাস্থ্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপযোগী সেবা দেওয়া হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিটি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলার কথা জানানো হয়েছে, যেখানে বিশেষায়িত চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি জেলা হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করে হৃদরোগ, ক্যানসার, মানসিক স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট কাটাতে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ নারী হবেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পৃথক কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। টিকাদান, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশু পুষ্টি এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রশিক্ষিত কর্মীরা কাজ করবেন।
নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধিকে স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল হেলথ ম্যানেজমেন্ট, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ, ই-প্রেসক্রিপশন এবং প্রেসক্রিপশন অডিট চালুর কথাও জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ওষুধের অপব্যবহার রোধ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মান নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক মান নিয়মিত মূল্যায়ন করবে।
মেডিকেল শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়, এই সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে মানবিক, সুলভ ও সবার জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এম/ক.ম

