ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আর প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ফলে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারেন না। তাকে ছাড়াই দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভারতের ইংরেজি ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ প্রকাশ করে ম্যাগাজিনটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‘দ্য উইক’-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট এডিটর নম্রতা বিজি আহুজা।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের দিকে ঝুঁকেছে। তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পরিবারের দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং বিএনপির একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ।
সাক্ষাৎকারে বিএনপির সংস্কার এজেন্ডা, ভারতের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল।
শেখ হাসিনার ভূমিকা ভবিষ্যতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) একটি ফ্যাক্টর, তবে তা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এই সংকট তৈরি করেছেন। দীর্ঘ মেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক তার ঊর্ধ্বে গিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে এবং এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি—অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী—জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি নির্বাচন চায়, যা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে। প্রায় ১৫ বছর ধরে নাগরিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্ম আছে, যারা কখনও সত্যিকার অর্থে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মধ্যে অবশেষে সেই অধিকার প্রয়োগের জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি ভোটার উপস্থিতি বেশ ভালো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো বড় অস্থিরতা বা গুরুতর বাধা আশা করি না, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে এবং সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিছু সমস্যা সবসময়ই থাকে, তবে আমি মনে করি না যে এগুলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার মতো যথেষ্ট গুরুতর। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং জনগণকে ভোট দেওয়ার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করা হয়েছে।’
জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনী জোট নিয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে, যখন আমরা একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলাম, তখন আমরা বাম ও ডান উভয় দিক থেকেই বেশ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছি। মোট ২০–২৪টি রাজনৈতিক দল সেই সংগ্রামে বিএনপির সঙ্গে ছিল। আমরা যখন আমাদের ৩১ দফা সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করি, তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—আমরা যদি সরকার গঠন করি, তাহলে এটি হবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় আমাদের সঙ্গে থাকা দলগুলোকে নিয়ে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সরকার। সেই প্রতিশ্রুতি এখনও বহাল আছে। তবে যে দলগুলো সেই সংগ্রামের অংশ ছিল না, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।’
জাতীয় ঐক্য সরকারে জামায়াতে ইসলামীও অন্তর্ভুক্ত হবে কি না—জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই এবং আমি মনে করি না যে জামায়াত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় সরকারের অংশ হবে।’
ছাত্রদের গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বিএনপি কেন জোট করেনি—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এনসিপি অনেক বেশি আসন দাবি করেছিল, যা দেওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের প্রার্থীরা সেই সব আসনে জয়ী হতে পারবেন। কিন্তু একেবারে নতুন প্রতীক নিয়ে এনসিপি প্রার্থীরা জিততে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক বেশি।’
আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় এই নির্বাচনটিও কি বিগত নির্বাচনের মতো হবে—এই প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। আমি যা জানি তা হলো, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আগে যুক্ত এমন কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। শেখ হাসিনা তার দলকে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই চলছে এবং জনগণ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমি মনে করি না আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। আদর্শভাবে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে পুনরায় আবির্ভূত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি এবং এখন এর কোনো সুযোগ নেই, কারণ শেখ হাসিনা দলের মধ্যে বিকল্প নেতৃত্বের অনুমতি দেন না।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে উল্লেখ করে ফখরুল আরও বলেন, তার প্রত্যাবর্তন অসাধারণ উদ্দীপনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তিনি তার প্রথম ভাষণে তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১৮ মাসের মধ্যে কমপক্ষে এক কোটি তরুণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ ছাড়া তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক কল্যাণ, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সাংবিধানিক সংস্কার, শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার এবং প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা ও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছে—এই প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে। এটিই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে সব প্রতিবেশী দেশকে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও তাদের জনগণের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
সূত্র: দ্য উইক
এমএইচআর

