বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

১১ দলের ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শীর্ষ নেতাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

১১ দলের ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শীর্ষ নেতাদের
১১ দলের ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শীর্ষ নেতাদের। ফাইল ছবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস ও জাগপাসহ ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জোটের কয়েকটি দলে অসন্তোষ দেখা দিলেও শীর্ষ নেতারা বলছেন, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং ঐক্য ধরে রাখতেই সবাই আপসের পথে হাঁটছে।

নেতারা বলছেন, আসন সমঝোতা ও জোটে নতুন দল যুক্ত করা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের টানাপোড়েন এখন শেষের পথে। দূরত্ব ঘুচিয়ে ১১ দলীয় জোটের বৃহত্তর স্বার্থে একে অপরকে ছাড় দেওয়ার কথা ভাবছেন তারা। 


বিজ্ঞাপন


চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের মে মাসে ইসলামভিত্তিক কয়েকটি দল একত্র হয়ে এই রাজনৈতিক জোটের যাত্রা শুরু করে। শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি জোটভুক্ত হয়। পরে জাগপা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি যুক্ত হলে এটি আট দলে রূপ নেয়। বিভিন্ন সময়ে যুগপৎ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই জোটকে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেখা যায়।

পরবর্তীতে তরুণদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং আরও দুটি দল যুক্ত হলে জোটটি ১১ দলে সম্প্রসারিত হয়। এই পর্যায়ে এসে আসন সমঝোতা ও জোটের নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে ভেতরে ভেতরে মতভেদ প্রকট হয়।

আসন সমঝোতা নিয়ে চাপা অসন্তোষ


বিজ্ঞাপন


জোটের ভেতরে দফায় দফায় বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, যে কয়টি আসনে আপাতত সমঝোতা হয়েছে, তা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। দলটির দাবি, জোটগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৫ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২৭২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে দলটি জোটের ভেতর থেকেই শক্ত অবস্থান নিয়ে দরকষাকষির কৌশল নিয়েছে, অথবা একক শক্তি প্রদর্শনের জন্য বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান খোলা রেখেছে।

কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র এ বিষয় অস্বীকার করে বলেন, এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও আলোচনা ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে এবং উভয়পক্ষই স্যাক্রিফাইসের মানসিকতা নিয়েই এগোচ্ছে।

অন্যদিকে, জোটের প্রার্থীদের জন্য আসন ছেড়ে দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কিছু স্থানীয় নেতাকর্মীর মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি জেলার সাংগঠনিক ইউনিট দাবি তুলেছে, নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে প্রার্থী ছাড় দেওয়া হলে কর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জোটের কয়েকটি দল বলছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলক বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। তবে জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, এটি আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বভিত্তিক জোট নয়, বরং নির্বাচনী সমন্বয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় একক প্রার্থী দেওয়াই মূল নীতি।

কে কত আসন পেলো, কে কতটা অসন্তুষ্ট

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শুরুতে ৫০টির বেশি আসন চাইলেও সমঝোতায় আসন নিশ্চিত হয়েছে ১৩টি। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসন সমঝোতা দেরিতে হওয়ায় প্রার্থীদের মাঠে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে দলটি।

খেলাফত মজলিশকে দেওয়া হয়েছে পাঁচটি আসন। নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন পেয়েছে দুটি করে আসন। জাগপা ও বিডিপির জন্য রাখা হয়েছে একটি করে আসন।

নতুন যোগ দেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরুতে অর্ধশতাধিক আসন চাইলে আলোচনায় ৩০ আসনে সমঝোতা হয়। শেষ পর্যন্ত ২৬টি আসনে থাকতে হয়েছে দলটিকে। তরুণ নেতৃত্বের এই দলটির দাবি, এর মধ্যেই তারা রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক বার্তা পেয়েছে।

নেতৃত্বের প্রশ্নে ঠাণ্ডা দ্বন্দ্ব

জোটে এনসিপি যুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় অধিক প্রভাব রাখবে জামায়াতে ইসলামী, নাকি নতুন প্রজন্মের দল এনসিপি।

কিছু দলের নেতারা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী আগের কাঠামো ধরে রাখতে চায়, আর এনসিপি জোটে তুলনামূলক সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। যদিও জোটের শীর্ষ নেতারা নেতৃত্ব–সংক্রান্ত যে কোনো মতভেদ অস্বীকার করছেন এবং বলছেন, এখানে পদ–পদবি নয়, আসনসমন্বয়ই মূল বিষয়।

নেতৃত্বের প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেন, জোটের নেতৃত্ব বা মুখপাত্র কে হবেন এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। এটা সেরকম কোনো জোট না।

তিনি বলেন, আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। এখানে পদ-পদবি নিয়ে, দ্বায়িত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। এখানে সবাই সমান মর্যাদার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।

নির্বাচনী প্রেক্ষাপট

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ৩০০ আসনে ৩ হাজারের বেশি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ হলেও জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৬৮টি। প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর বাইরে এই ১১ দলীয় সমন্বয়কে অনেক বিশ্লেষক বিকল্প রাজনৈতিক ব্লক হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী বরাবরই এককভাবে জাতীয় নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পায়নি। তাই তারা রাজনৈতিক পরিধি সম্প্রসারণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি কমাতে জোটের কাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে অতিরিক্ত বিস্তৃত জোট কাঠামোই এখন তাদের জন্য সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সমঝোতা কত দূর এগিয়েছে

জোটের সমন্বয় কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, নতুন দল যুক্ত হওয়ায় আগের তালিকা পুনর্গঠন করতে হয়েছে। সে কারণে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে। প্রতিদিন বৈঠক হচ্ছে, মাঠের বাস্তবতা যাচাই করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত আসন তালিকা প্রকাশ হতে পারে।

জোটের একজন শীর্ষ নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন আর কোনো দলের দাবি বা কোটার ভিত্তিতে নয়, বরং যে প্রার্থীকে দিলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিছু ক্ষেত্রে অসন্তোষ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর