বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ, ২০২৫, ঢাকা

ফেসবুক পোস্টে এনসিপি নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, অস্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২৫, ০৭:৪৫ এএম

শেয়ার করুন:

loading/img

নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে দলের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও ফেসবুক পোস্টের কারণে অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতা, দলের আনুষ্ঠানিক ফোরামে আলোচনা না করে নিজেদের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বক্তব্য প্রচার করছেন। এতে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে কিছু নেতা এমন বক্তব্য দিচ্ছেন যা দলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং দলের অবস্থান সম্পর্কে জনমনে ভুল বার্তা যাচ্ছে।

এছাড়া, কিছু রাজনৈতিক সভা-সমাবেশেও নেতাদের এমন মন্তব্য দেখা গেছে, যা দলের স্বার্থে ক্ষতিকর হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই ধরনের বক্তব্যের কারণে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, এসব বক্তব্যের কারণে দলের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। অনেক নেতা মনে করেন, রাজনীতির টেবিলে কিছু বিষয় আলোচনা হয়, তবে সব বিষয় জনসম্মুখে আসা উচিত নয়, এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আরও সতর্ক থাকতে হবে।


বিজ্ঞাপন


দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, এনসিপি তার রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছে এক্টিভিজমের মাধ্যমে। তারা গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এক্টিভিজমের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। কিন্তু রাজনীতি এবং এক্টিভিজম এক নয়। এক্টিভিজমে ব্যক্তিগত মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, রাজনীতিতে সেই ব্যক্তিগত মতামত দলীয় অবস্থান হিসেবে পরিণত হয়। তিনি আরও বলেন, দলের কয়েকজন নেতার বক্তব্যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি আশা করেন, নেতারা শীঘ্রই এই বিষয়টি বুঝতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন। দলের অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ে সকলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক সাক্ষাৎকারে একটি উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই সাক্ষাৎকারে, ড. ইউনূস জানিয়েছেন, তার সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার। প্রধান উপদেষ্টার এ বক্তব্যের পর, এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখপাত্র হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন যে, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন করার জন্য একটি ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, ১১ মার্চ সেনানিবাসে তাদের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেখানে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা ছিল, এবং এতে ভারতীয় ভূমিকা ছিল। হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্টে দাবি করেন, শিরীন শারমিন, সাবের হোসেন চৌধুরী এবং তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তাদেরকে আসন সমঝোতার বিনিময়ে এই প্রস্তাব মেনে নিতে বলা হয়েছিল এবং কিছু রাজনৈতিক দলও শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে রাজি হয়েছিল।

হাসনাতের এমন দাবির পর ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং এনসিপি’র মধ্যে অস্বস্তি শুরু হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করে, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। দলের অনেক নেতাকর্মী সেনাবাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের মতামতও প্রকাশ করেন, যা দলের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়।

এ বিষয়ে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত হয়নি। তিনি বলেন, এটি একটি শিষ্টাচারবর্জিত স্ট্যাটাস ছিল, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি তুলে ধরেছে। নাসীরুদ্দীন আরও জানান, এনসিপি মনে করে যে, সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক জায়গায় হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন, এই ধরনের হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলতে।

এদিকে, সেনাসদরের বরাত দিয়ে সুইডেনভিত্তিক ‘নেত্র নিউজের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্ট ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ ছাড়া কিছু নয়। সেনাবাহিনী হাসনাতের বক্তব্যকে ‘অপরিপক্ব গল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এরপর, ১১ মার্চের ক্যান্টনমেন্টের বৈঠকে হাসনাতের সঙ্গে উপস্থিত থাকা এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম হাসনাতের বক্তব্যের বিরোধিতা করে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি জানান, ফেসবুকে হাসনাতের স্ট্যাটাসে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা উপযুক্ত ছিল না। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের বক্তব্যের ফলে পরবর্তীতে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং অন্য রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

এনসিপি’র অভ্যন্তরীণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দলের নেতারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য একে অপরকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন। দলের মধ্যে এমন শৃঙ্খলা বিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায়, তারা শীঘ্রই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ করেছে। জানা গেছে, আনঅফিসিয়ালি নিজেদের ভুল স্বীকারও করেছেন এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন।

এই পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন, এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সেনা অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে আখ্যা দেন। একই স্ট্যাটাসে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে পুনর্বাসনের বিষয়েও অস্বস্তিকর মন্তব্য করেন। নাসীরের এই মন্তব্যের পর যখন ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়, তখন তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এরপর, এনসিপি তাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সকল নেতাকর্মীকে ফেসবুক ব্যবহারে সতর্ক থাকতে কড়া নির্দেশনা দেয়। দলটি মনে করছে, নেতারা যদি অযাচিত মন্তব্য করেন, তবে এটি জনগণের মধ্যে দলটির প্রতি আস্থা কমিয়ে দিতে পারে, তাই তাদের ফেসবুক ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

এইউ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর