সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

রাজনীতিতে রওশন ‘চ্যাপ্টার ক্লোজ’!

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজনীতিতে রওশন ‘চ্যাপ্টার ক্লোজ’!
ছবি: ঢাকা মেইল

• ৩২ বছরের মধ্যে এবার প্রথম মনোনয়ন বঞ্চিত 
• ঘনিষ্ঠরাও সবাই কোণঠাসা
• বিরোধী দলীয় নেতা হলেন দেবর জিএম কাদের
• রওশনের দেওয়া অব্যাহতি আমলে নিচ্ছেন না চুন্নুরা
 
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী হিসেবে বেশ প্রভাবের সঙ্গে কয়েক যুগ ধরে রাজনীতি করেছেন রওশন এরশাদ। ছয়বারের সংসদ সদস্য। দুই মেয়াদে ছিলেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ ও সরকারের সঙ্গে জাপার ‘সমঝোতা’ রাজনীতির মারপ্যাঁচ, বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে এখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটছে বলে আলোচনা চলছে ঘরে-বাইরে। টানা ৩২ বছর পর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মেলেটি দলীয় মনোনয়ন। ফলে ছিটতে পড়েছেন সংসদ থেকেও। উল্টো সংসদে তার আসনে এবার বসতে যাচ্ছেন দেবর জিএম কাদের। ইতোমধ্যে জাপা চেয়ারম্যানকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে অনুমোদন দিয়েছেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সরকারের আনুকূল্য পেয়ে দলে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন- এমন একটা প্রত্যাশা ছিল রওশন এরশাদ ও তার ঘনিষ্ঠ নেতাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বরং নির্বাচন থেকেই ছিটকে পড়েছেন তারা। 

অন্যদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দুই দিন আগে রোববার (২৮ জানুয়ারি) জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মজিবুল হক চন্নুকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন রওশন এরশাদ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার সেই এখতিয়ার আছে কি না সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। আর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ থেকেও বেগম রওশন এরশাদের ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


রোববার গুলশানে নিজের বাসায় দলের ‘ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত’ নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করে এই ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদের স্ত্রী। তার এই ঘোষণা নিয়ে আলোচনার মধ্যে জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা করে গেজেট প্রকাশ করেছে সংসদ সচিবালয়। 

এদিকে রওশন এরশাদের সিদ্ধান্তকে আমলেই নিচ্ছেন না জিএম কাদেরপন্থীরা। দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই বলে মনে করছেন। তিনি বলেছেন, ‘উনি (রওশন এরশাদ) বাদ দিয়েছেন, আমরা এটা আমলে নিচ্ছি না। গঠনতন্ত্রের বাইরে মনের মাধুরী মিশিয়ে যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো কথা বলতেই পারেন। তাদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।’

আরও পড়ুন
কাদের-চুন্নুকে অব্যাহতি, নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা রওশনের

রাজনীতিতে যেভাবে আলোচনায় রওশন এরশাদ
দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করা রওশদ এরশাদ ১৯৪১ সালের ১৯ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ‘সেনা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন।


বিজ্ঞাপন


২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রওশনের নেতৃত্বে জাপার অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। সরকারের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যতাও ছিল তার। এবারেও তেমন গুরুত্ব পাবেন এমন আশায় ছিলেন রওশনপন্থীরা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিনিই প্রথম স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়নি। জাপার চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে দায়ী করে রওশন এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। 

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বারবার চেষ্টাতেও প্রধানমন্ত্রীর যখন সাক্ষাৎ পাচ্ছিলেন না রওশন এরশাদ তখনই আলোচনা শুরু হয় তার গুরুত্ব ও দলে ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ পেলেও কোনো কাজে আসেনি। যদিও রওশন এরশাদ নির্বাচনী মাঠ থেকে ছিটকে যাবেন এটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। 

রওশন এরশাদ ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছয়বারের সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ২০০৮ সালে তিনি ভোটে হেরে যাওয়ার পর উপনির্বাচনে এরশাদের ছেড়ে দেওয়া রংপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদ আমৃত্যু এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে সাদ এরশাদ সংসদ সদস্য হন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে শুধু রওশন নন, রওশনের ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ এবং তার ঘনিষ্ঠদেরও অনেকেই মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি সাদ যে আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন সেখানে এবার চাচা জিএম কাদের প্রার্থী হয়েছিলেন এবং বিজয়ীও হয়েছেন। 

এরশাদের মৃত্যুর পর মূলত বিপদ বাড়তে থাকে রওশন এরশাদের। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুতে জাপায় কোন্দল বেড়ে যায়। এক অংশের নেতৃত্ব দেন বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের, অন্য অংশের নেতৃত্বে ছিলেন রওশন এরশাদ। দীর্ঘদিন ধরে জাপায় দুটি ধারা চলে আসছিল। এবার রওশন এরশাদ নির্বাচনে না আসায় জিএম কাদের এককভাবে জাপার নেতৃত্বে। অন্যদিকে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন রওশন এরশাদ ও তার ঘনিষ্ঠরা। 

আরও পড়ুন
‘অব্যাহতির’ ঘোষণা আমলে নিচ্ছি না: চুন্নু

অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে বেকায়দায় রওশন!
৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে জাতীয় পার্টিতে নতুন করে বিভক্তি দেখা দেয়। দেবর জিএম কাদেরের সঙ্গে মতবিরোধে গত সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন নিজে এবার নির্বাচনে অংশ নেননি। তার অনুসারীদের কাউকেই মনোনয়ন দেয়নি জাতীয় পার্টি।    নির্বাচনের পর পার্টি থেকে প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ কয়েকজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যারা রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত। এরপর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ অভিযোগ এনে ৬৭১ জন নেতাকর্মী পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এই প্রেক্ষাপটে ‘পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে’ রোববার রওশন এরশাদের মতবিনিময় সভা ডাকা হয়। যেখানে জিএম কাদের ও চুন্নুর কঠোর সমালোচনা করে তিনি নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পাশাপাশি চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে অব্যাহতি দেন।

সভায় রওশন এরশাদ বলেন, ‘আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন জাতীয় পার্টিতে এখন একটি ক্রান্তিকাল বিরাজ করছে। দ্বাদশ নির্বাচনের পূর্বে পার্টির চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের বক্তব্য ও বিবৃতি এবং দ্বাদশ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাদের ভূমিকা পার্টিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পার্টির ভালোর জন্য, পার্টির ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আমি নিজে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলাম এবং পরবর্তী কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত মামুনুর রশীদকে মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করলাম। তিনি সার্বিকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।’

এসময় তিনি বহিষ্কার ও কমিটির বাইরে থাকা নেতাদের আগের পদে ‘পুনর্বহালের’ ঘোষণা দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্টির জাতীয় সম্মেলন করার কথা বলেন। 

পার্টি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিরোধের প্রসঙ্গ ধরে প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন বলেন, ‘পার্টির অবস্থা সার্বিকভাবে বিবেচনা করে আমি গত ২২ জানুয়ারি পার্টির চেয়াম্যান ও মহাসচিবকে দলে ঐক্য ফিরিয়ে এনে সকল বহিষ্কার ও অব্যাহতির আদেশ বাতিল করে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টি গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা তা আমলে নেননি। এই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পল্লীবন্ধুর ৬৬৮ জন নেতাকর্মী পার্টি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করায় দলে বিরাট সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’

রওশনের কাছ থেকে মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়া কাজী মামুনুর রশিদ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরবর্তী কাউন্সিল হওয়া পর্যন্ত আমি মহাসচিব হিসেবে থাকব। আমি চেষ্টা করব সংগঠনের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে। ফেব্রুয়ারিতে অথবা মার্চের প্রথম সপ্তাহে কাউন্সিল হবে।’

আরও পড়ুন
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদের, উপনেতা আনিসুল

যা বলছেন মুজিবুল হক চুন্নু
এদিকে ওই ঘোষণার পরপরই দুপুরে বনানীতে দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে মুজিবুল হক চুন্নু এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্রে এমন কোনো ক্লজ নাই যে, পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক চেয়ারম্যান, মহাসচিবকে বাদ দেবেন। উনি যে বাদ দিয়েছেন এই নিয়ে তৃতীয়বার তিনি বাদ দিয়েছেন।’

রওশন এরশাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বেগম রওশন এরশাদ প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের স্ত্রী। সেই শ্রদ্ধা থেকে তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক করি। এটা একটা আলংকারিক পদ। তার দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নাই। কাজেই অলংকারিক পদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে মনে করি না।’

বিইউ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর