১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক সংঘাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আবির্ভূত ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্থিতিশীলতা, সংহতি এবং নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এই দিনটি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
৭ নভেম্বরের তাৎপর্য বুঝতে হলে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড দেশকে রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করে। পরবর্তী সময়ে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আরও বাড়িয়ে তোলে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন।
এরপর ৭ নভেম্বর সেনা সদস্যদের বিদ্রোহ ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দেয়। বিদ্রোহী সেনাসদস্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। এই অভ্যুত্থানের পেছনে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং সামরিক সংঘাতের অবসানের প্রত্যাশা কাজ করেছিল। যদিও এ ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থ জড়িত ছিল এবং খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে, তবু ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা, সংহতি ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অবদান ১৯৭৫ সালের অনেক আগে থেকেই শুরু। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসন পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। ধারাবাহিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সুস্পষ্ট উন্নয়ন কৌশলের প্রয়োজন ছিল। তাঁর সরকার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উদ্যোগ নেয়।
জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদান ছিল বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পুনঃপ্রবর্তন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর তাঁর সরকার ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর উন্মুক্ত করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও তাঁর শাসনামলের সূচনা সামরিক আইনের অধীনে হয়েছিল এবং সরকারে কর্তৃত্ববাদী বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান ছিল, তবু নির্বাচনী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, নাগরিক পরিচয় এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এই দর্শন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চায় স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও খাদ্যসংকটের বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষির উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাঁর সরকার সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন ও পুনঃখনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জনগণের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করে। এসব উদ্যোগের মূল দর্শন ছিল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের পরবর্তী শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশে একাধিক সরকার, উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের অবদান থাকলেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারি খাতের প্রতি নীতিগত গুরুত্বের বিষয়টি স্বীকার করা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে বাস্তববাদী ও বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা তাঁর অন্যতম দূরদর্শী উদ্যোগ। তাঁর প্রস্তাব ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ১৯৭৯-১৯৮০ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে।
তবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নে এর জটিল ও বিতর্কিত দিকগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাঁর শাসনামলে সামরিক কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক বিধিনিষেধ, বিতর্কিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয় ইতিহাসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিক বিচার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার অর্থ তাঁর অবদান অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাসের মূল্যায়নকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ করা।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নের জন্ম দেয়। তবে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে এই দিনের তাৎপর্য অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে নতুন দিকনির্দেশনা খুঁজছিল। কৃষি উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে জিয়াউর রহমানের অবদান আজও জাতীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় সংহতি, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাঁর সীমাবদ্ধতাহীনতার মধ্যে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে এমন কিছু নীতি ও উদ্যোগের মধ্যে নিহিত। তাই ৭ নভেম্বর স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা স্মরণ করা নয়; বরং ইতিহাসের অবদানগুলো স্বীকার করা, ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং আরও গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া




