রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর: মানবসেবা ও স্বনির্ভরতার প্রত্যয়

অধ্যাপক ড. জি. এম. রবিউল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর: মানবসেবা ও স্বনির্ভরতার প্রত্যয়
অধ্যাপক ড. জি. এম. রবিউল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

১৮ অক্টোবর ২০২৬। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। একটি প্রতিষ্ঠানের জীবনে ২৭ বছর কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয়কে নতুন করে মূল্যায়ন করার উপলক্ষ।

১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে ধারণ করে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের যে প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যয়কে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফাউন্ডেশনটির ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত সংবাদেও এর দীর্ঘ পথচলা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা উঠে এসেছে। আজকের দিনে অতীতের অর্জন স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের দায়িত্ব নির্ধারণ করাও জরুরি। কারণ, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা বর্তমানের মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত সমাজ গঠনের প্রেরণা জোগায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, নিরাপদ পানি, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিজ্ঞানচর্চা এবং কর্মসংস্থানের মতো ক্ষেত্রগুলোতে জনমুখী উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যেমন পুষ্টি ও চিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি তার ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা। একজন কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যেমন উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ন্যায্য বাজারমূল্য। আর একজন তরুণের মেধা বিকাশের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নতুন ধারণা বাস্তবায়নের সুযোগও অপরিহার্য।

জেডআরএফের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে কৃষি, নিরাপদ পানি, বৃক্ষরোপণ, শিক্ষা এবং তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ রয়েছে। ফাউন্ডেশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে কোমল পানি প্রকল্প, কোমল বীজ প্রকল্প, হাঁপানি পরিচর্যা ও প্রতিরোধ কেন্দ্র, শহীদ জিয়াউর রহমান শিশু হাসপাতাল, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক বৃক্ষরোপণের মতো প্রকল্পের বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের প্রকৃত গুরুত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কর্মসূচির ঘোষিত উদ্দেশ্যের পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যা, সেবার মান, ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের ২২ আগস্ট ঢাকার ভাষানটেক, কড়াইল ও সাততলা এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষুসেবা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে প্রায় এক হাজার মানুষকে চক্ষু পরীক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও চশমা বিতরণ করা হয় এবং ছানি আক্রান্ত রোগীদের শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুসারে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যাঁরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না, তাঁদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে রোগীদের পরবর্তী চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের অগ্রগতি অনুসরণ করাও জরুরি।

সিলেট অঞ্চলেও ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্যসেবামূলক কর্মকাণ্ডের নজির রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, জকিগঞ্জে মাসব্যাপী বিনামূল্যের চক্ষুশিবিরের উদ্বোধনী দিনে প্রায় ১,৫০০ নারী-পুরুষকে ১২টি বুথের মাধ্যমে চক্ষুসেবা দেওয়া হয়। কর্মসূচির পরবর্তী পর্যায়ে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চক্ষুশিবির আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। এ ধরনের উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগিতা ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরে।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ফাউন্ডেশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার জুরাইন রেলগেট অঞ্চলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং মশারি বিতরণ করা হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৪০০ জনকে মশারি ও সচেতনতামূলক লিফলেট দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় ডেঙ্গু ও কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পাঁচ হাজার লিফলেট ও মাস্ক বিতরণের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে বরগুনায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে এক হাজারের বেশি আইভি স্যালাইনের ব্যাগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মশা প্রতিরোধক সামগ্রী ও সচেতনতামূলক লিফলেট দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

এসব কার্যক্রম দেখায়, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর মতো রোগ মোকাবিলায় শুধু মশারি বিতরণ বা সচেতনতামূলক লিফলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মতো বিষয়গুলোকে ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ করতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, চিকিৎসক এবং নাগরিক সংগঠন একসঙ্গে কাজ করলে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে।

Zia1

স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাউন্ডেশনের কোমল পানি প্রকল্পের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানীয় জলের সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রকল্পের বিবরণে পানি পরিশোধনব্যবস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপকার এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ পানি মানুষের মৌলিক চাহিদা; এটি শিশুদের স্বাস্থ্য, পরিবারের জীবনমান এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই পানি সরবরাহের পাশাপাশি পানির গুণগত মান পরীক্ষা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জেডআরএফের কার্যক্রম সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না; তাঁরা দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তিকে শক্তিশালী করেন। অথচ উৎপাদন ব্যয়, বাজারদরের অনিশ্চয়তা, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাঁদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ফাউন্ডেশনের কোমল বীজ প্রকল্প কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের একটি উদাহরণ। এ ধরনের প্রকল্পকে উন্নত বীজ, কৃষি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসলের অপচয় হ্রাস এবং বাজারসংযোগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষকদের উপকার আরও বিস্তৃত হতে পারে।

কৃষির উন্নয়নকে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও উচিত নয়। উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ কি না, তা পুষ্টিমান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে কি না এবং সাধারণ মানুষ সুষম খাদ্য গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পুষ্টিবিজ্ঞান এবং খাদ্যপ্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষিবিদ এবং স্থানীয় কৃষকদের সহযোগিতায় ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতে আরও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।

পরিবেশ সংরক্ষণেও জেডআরএফের উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের ১০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে নিমের চারা রোপণের মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। একই অনুষ্ঠানে ‘ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীর খোঁজে—বিজ্ঞান মেলা ২০২৬’-এরও উদ্বোধন করা হয়। এই দুই কর্মসূচিকে পাশাপাশি দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা এবং সেই পরিবেশ রক্ষায় বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বিকাশ—দুটিই টেকসই উন্নয়নের অংশ।

তবে বৃক্ষরোপণের সাফল্য শুধু কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে, সেগুলো স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী কি না, কতটি গাছ টিকে আছে এবং সেগুলোর পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, গাছের টিকে থাকার হার প্রকাশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যা কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে।

জেডআরএফের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোর একটি হলো তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে উৎসাহিত করা। ২০২৬ সালে ‘ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীর খোঁজে’ শীর্ষক বিজ্ঞান মেলার তৃতীয় আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাসস ও ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, গবেষক, উদ্ভাবক ও প্রযুক্তিপ্রেমীদের এতে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্মার্ট সমাধানের মতো বিষয়কে প্রকল্পের ক্ষেত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিজ্ঞান মেলার ঘোষিত পরিকল্পনায় সেরা পাঁচজন উদ্ভাবককে স্টার্টআপ গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও রয়েছে। এই উদ্যোগের তাৎপর্য শুধু পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বৈজ্ঞানিক ধারণাকে কার্যকর পণ্য, প্রযুক্তি বা সেবায় রূপান্তরিত করতে হলে অর্থায়ন, পরামর্শ, পরীক্ষাগার, বাজার বিশ্লেষণ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সহায়তা প্রয়োজন। বিজ্ঞান মেলার নির্বাচিত প্রকল্পগুলোকে পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে তরুণদের উদ্ভাবন বাস্তব সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারবে।

ফাউন্ডেশনের বিজ্ঞান মেলার নিবন্ধন পাতায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতার জন্য মোট ৪৫৭টি জমা পড়া প্রকল্পের তথ্য প্রদর্শিত হয়েছিল। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় ১৭৪টি, খুলনায় ৬১টি, রাজশাহীতে ৫৫টি, চট্টগ্রামে ৪৯টি, রংপুরে ৩৫টি, সিলেটে ৩৪টি, ময়মনসিংহে ৩১টি এবং বরিশালে ১৮টি জমা দেখানো হয়েছিল। এই সংখ্যা তরুণদের উদ্ভাবনী কার্যক্রমে আগ্রহের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রকৃত অংশগ্রহণ, প্রকল্পের মান, চূড়ান্ত নির্বাচনের সংখ্যা এবং পরবর্তী পর্যায়ে কতটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিজ্ঞান মেলার প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করলেই চলবে না; তাদের গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি গ্রামের শিক্ষার্থীও কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ, নিরাপদ পানি, পরিবেশদূষণ কিংবা স্থানীয় স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনী প্রকল্প তৈরি করতে পারে। তার প্রয়োজন উপযুক্ত দিকনির্দেশনা, পরীক্ষার সুযোগ এবং নিজের ধারণা বাস্তবায়নের সহায়তা। জেডআরএফের বিজ্ঞান মেলাকে এই বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের একটি ধারাবাহিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা যেতে পারে।

মানবিক সহায়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ২০২৫ সালের মার্চে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইফতার ও ঈদ উপহার বিতরণের খবর প্রকাশিত হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) এবং জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট ২২৯ জন আহত ব্যক্তির কাছে ইফতার সামগ্রী ও শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। একই সময়ে ফাউন্ডেশন আহতদের চিকিৎসাসহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও জানিয়েছিল। এ ধরনের উদ্যোগের মানবিক গুরুত্ব রয়েছে, কারণ গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং পরিবারের জীবিকা রক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনা করা দরকার।

দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য ত্রাণ বিতরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যক্রমও ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত কার্যক্রমের অংশ। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করে সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছানো হয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা তা পেয়েছেন কি না এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে—তার ওপর। সাময়িক সহায়তা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এই কর্মকাণ্ডগুলোকে আরও কার্যকর করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তার কাজের মাধ্যমে। কতটি কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে, কতজন উপকারভোগী সেবা পেয়েছেন, কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা উচিত। ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রকল্পের বিবরণ প্রকাশ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ; এর সঙ্গে নিয়মিত কার্যক্রম প্রতিবেদন, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং ফলাফল মূল্যায়নের তথ্য যুক্ত হলে জনআস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জেডআরএফের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রতিষ্ঠাতার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের কারণে এর কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মতামত, প্রশ্ন কিংবা সমালোচনা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমালোচনার মূল্যায়ন করতে হলে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করা জরুরি। এই অনুসন্ধানে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সংবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেছে; তবে সংগঠনটির বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো নির্দিষ্ট সমন্বিত বিরোধী তৎপরতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অনুমান বা অযাচাইকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে প্রকৃত কর্মকাণ্ড, প্রকাশিত তথ্য এবং জনকল্যাণে অর্জিত ফলাফল নিয়ে আলোচনা করাই যুক্তিসংগত।

Zia3

একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু সমর্থকদের প্রশংসায় নয়; বরং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা, ভুল থাকলে তা সংশোধন করার মানসিকতা এবং মানুষের আস্থা অর্জনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় নিহিত। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; এগুলো তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ায়। জেডআরএফের মতো সংগঠন যত বিস্তৃত হবে, ততই তথ্য প্রকাশ, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং উপকারভোগীদের মতামত গ্রহণের গুরুত্ব বাড়বে।

আগামী দিনে ফাউন্ডেশনের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার থাকতে পারে। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবায় এককালীন কর্মসূচির পাশাপাশি রোগীদের পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণকারী তরুণদের প্রকল্প উন্নয়নে ধারাবাহিক সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান। তৃতীয়ত, কৃষি, নিরাপদ পানি ও পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পর্যবেক্ষণ। চতুর্থত, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, শিক্ষক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, গবেষক, আইনজীবী এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা জনকল্যাণে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের কাজে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশেও সহায়তা মিলবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠীর কাজ নয়। রাষ্ট্রের নীতি ও সেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা, বেসরকারি উদ্যোগ, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই একটি উন্নত সমাজ গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপদ পানি এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মতো মৌলিক বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ বিস্তৃত করা সম্ভব।

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের দিন নয়; এটি ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণেরও সময়। ফাউন্ডেশনের যেসব উদ্যোগ ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনছে, সেগুলোকে আরও বিস্তৃত করা, যেসব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করা এবং নতুন সামাজিক চাহিদার সঙ্গে কর্মসূচিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি। মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে একটি সংগঠনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা উভয়ই বৃদ্ধি পায়।

আমরা যারা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। কারও জ্ঞান, কারও সময়, কারও অভিজ্ঞতা, কারও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা কারও আন্তরিক সহযোগিতা মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, একজন রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, একজন কৃষককে উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করা কিংবা একজন তরুণের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া—প্রতিটি উদ্যোগই একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের অংশ।

২৭ বছরের পথচলার অভিজ্ঞতা নিয়ে জেডআরএফ এগিয়ে যাক আরও জনমুখী, দক্ষ, স্বচ্ছ এবং মানবিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার প্রত্যয়ে। আমাদের প্রত্যাশা, ফাউন্ডেশনের প্রতিটি কর্মসূচি মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে, তরুণদের মেধা বিকাশে সহায়তা করবে এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নকে আরও বাস্তব করে তুলবে।

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উত্তরাধিকার তার নাম কিংবা স্মৃতিচিহ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেই তার স্থায়ী মূল্য নিহিত। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—মানুষের পাশে থাকা, মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, মানবিকতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

লেখক: প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর