প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় আসার সুযোগ না দিয়ে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে ইসরায়েলজুড়ে বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এর আগে একই দাবিতে বৃহস্পতিবার রাতে বহু মানুষ ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটের বাড়ির সামনে প্ল্যাকার্ড-ব্যানার হাতে জড়ো হয়েছিলেন।
এবারের ভোটে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে কট্টর ডানপন্থী ইহুদি দলগুলোর ক্ষমতাসীন জোট ৫৩টি আসনে জয় পেয়েছে। বিপরীতে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। ইহুদিদের নেতৃত্বে থাকা দলগুলোর এ জোট ‘চেঞ্জ ব্লক’ নামে পরিচিত। এ ব্লকের চারটি দল হলো- গাদি আইজেনকটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের বি’ইয়াচাদ, ইয়ার গোলানের দ্য ডেমোক্র্যাটস এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু।
আরবদের নেতৃত্বে থাকা দুই দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম যথাক্রমে ১১টি ও ৮টি আসনে জিতেছে। অর্থাৎ নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের চেয়ে এবার নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বেশি আসন (৬৭) পেয়েছে। ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠন করতে ৬১ আসন প্রয়োজন।
এবারের নির্বাচনের আগে ব্যাপকভাবে জানা যায়নি, ইসরায়েলে আরব দলগুলোর প্রভাবের কথা। নির্বাচনের পর ইসরায়েলের ‘জয়েন্ট লিস্ট’ আলোচনায় এসেছে।
প্রশ্ন হলো, জয়েন্ট লিস্ট কারা?
জয়েন্ট লিস্ট মূলত আরব-ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি জোট। এর লক্ষ্য, পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোট ভাগ হওয়া ঠেকানো এবং ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নেসেটে আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো।
জোটটির আরব নাগরিকদের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার, ইসরায়েলের দখলনীতি ও বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে স্বোচ্ছার।
যেহেতু জয়েন্ট লিস্ট একটি রাজনৈতিক জোট, তাই এটি একক আদর্শের দল নয়। এর অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর আদর্শ ও রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য রয়েছে।
জয়েন্ট লিস্ট গঠিত হয় ২০১৫ সালের ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে। সে সময় চারটি আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই ঐক্যের পেছনে কারণ ছিল ইসরায়েলের নির্বাচনি ব্যবস্থায় সংসদে প্রবেশের ন্যূনতম ভোটের হার। নির্বাচনে প্রতিটি দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতে হয়। পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ছোট দলগুলোর জন্য সংসদে প্রবেশ করা কঠিন। জোট গঠনের মাধ্যমে একত্রে নির্বাচন করে সংসদে বেশি আসন পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মূল লক্ষ্য।
২০১৫ সালে প্রথমবার একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ১৩টি আসন পায়। পরবর্তী সময়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়; জোট ভেঙে যায়, আবার পুনর্গঠিত হয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট ১৫টি আসন পেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল।
এবার নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট তিনটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। হাদাশ (Hadash), পূর্ণ নাম Democratic Front for Peace and Equality। এটি বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, যার ঐতিহাসিক শিকড় ইসরায়েলের কমিউনিস্ট আন্দোলনে। দলটিতে আরব ও ইহুদি-উভয় সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছেন।
তাআল (Ta’al)। পূর্ণ নাম Arab Movement for Renewal। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের প্রধান নেতা আহমাদ তিবি। ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় অধিকারের প্রশ্নে দলটি সক্রিয়।
বালাদ (Balad)। পূর্ণ নাম National Democratic Assembly। দলটি আরব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। এর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দাবি হলো, ইসরায়েলকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে- রাষ্ট্রীয় পরিচয় শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হবে না।
আর অন্য দল রাআম আগে জয়েন্ট লিস্টের অংশ ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে দলটি জোট ছেড়ে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০২৬ সালেও রাআম জয়েন্ট লিস্টের বাইরে রয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য জয়েন্ট লিস্টের শীর্ষ নেতা হিসেবে রয়েছেন- ইউসুফ জাবারিন, তিনি হাদাশের নেতা। তাআলের নেতা আহমাদ তিবি জোটের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। আর বালাদের নেতা সামি আবু শেহাদেহ।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে জয়েন্ট লিস্টের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ২৩ সেপ্টেম্বর জোটটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে। তবে ২ অক্টোবর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে জোটটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়।
জয়েন্ট লিস্টের রাজনীতি বুঝতে হলে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তারা ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে ভোট দিতে ও নেসেটে প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন। একইসঙ্গে তাদের একটি বড় অংশ নিজেদের ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের অবস্থানের সঙ্গে এক করে দেখা হয় না। তাদের নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার এবং দৈনন্দিন বাস্তবতা ভিন্ন। জয়েন্ট লিস্ট মূলত ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী আরব-ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে; এটি সব ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শক্তির একক প্রতিনিধি নয়।
আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে চূড়ান্ত ফল এরই মধ্যে হাতে এসে যাওয়ায় জোট সরকার গঠের জন্য দর-কষাকষি শুরু হয়ে গেছে। এখন দেখা যাক, আরব দলগুলো কতটা রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করতে পারে। ইতোমধ্যে এক সাক্ষাৎকারে চেঞ্জ ব্লকের সদস্য দ্য ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়ার গোলান বলেছেন, বৃহস্পতিবার তিনি ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদের নেতা ইয়ার লাপিদ এবং রাআমের প্রধান মানসুর আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের তিনজনের মধ্যেই সরকার গঠনের ব্যাপারে গভীর প্রত্যয় দেখেছেন তিনি।
শুধু তারা নয়, পুরো বিশ্ব আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এমনকি ইসরায়েলের উদারপন্থী পত্রিকা হারেৎজ–এ মতামত কলামে গোলান আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের জোরালো আহ্বান জানিয়ে কলাম লিখেছেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না। তার যুক্তি, একজন আরব নাগরিকের ভোটের মূল্য একজন ইহুদি নাগরিকের ভোটের সমান। কয়েক লাখ নাগরিকের ভোট শুধু তাদের পরিচয় বা নামের কারণে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক




