বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় অংশ আসে এই দেশ থেকে। বৈধ পথে যত রেমিট্যান্স আসে, অবৈধ পথে এর চেয়েও বেশি আসে বলে ধারণা করা হয়। অথচ সৌদি আরবের বিকল্প বড় শ্রমবাজার এখনো আমরা তৈরি করতে পারিনি। এটি আমাদের সরকারি নীতির দুর্বলতা ও ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
সৌদি আরবে আমাদের দেশের নাগরিকরা কারাগারে আছেন। তাদের তথ্য সংরক্ষণ ও তদারকিতে আমাদের দূতাবাস ও কনস্যুলেট কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে? যারা ইকামা জটিলতায় আছেন, তাদের সমস্যা সমাধানে সরকারের তৎপরতা কতটুকু? অসুস্থ ও মৃত প্রবাসীদের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করা এবং ভিসা জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন ড. আসিফ নজরুল। সে সময় তিনি সৌদি আরবের শ্রমবাজারে তাকামুল সনদ নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি করেছেন। এ ব্যবস্থা চালুর পর ভিসা প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় বেড়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
দক্ষতা শুধু সনদের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর্মীদের দক্ষতা যাচাইয়ের নামে যেন বাড়তি ভোগান্তি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সফলতা না থাকলে অন্তত পুরনো বাজারের সমস্যাগুলো সমাধানে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সৌদি আরবের বড় কোম্পানিগুলোর অনেকেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করে। অন্যদিকে, ছোট কোম্পানিগুলো সরাসরি ভিসা প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। এই দুই ধরনের ব্যবস্থায় কর্মীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে যথাযথ তদারকি প্রয়োজন। কিছুদিন পরপর সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও কর্মীবান্ধব নীতির বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে আন্তরিকতা ও সঠিক তদারকি থাকলে এসব সমস্যার সমাধান অনেকটাই সম্ভব।
সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মী নিলেও বাংলাদেশিদের জন্য সুযোগ ধরে রাখতে হলে আমাদের দক্ষতা, সেবার মান ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। অথচ কম খরচে কর্মী পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে আমরা কতটা সফল, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সময় ব্যয় না করে প্রবাসীদের সমস্যা সমাধান ও তাদের স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
সৌদি আরবের আইনকানুন কঠোর। মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, গুরুতর নারী-সংক্রান্ত অপরাধ এবং অনুমোদনহীন আন্দোলনের মতো ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে পারে। তাই সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের দেশটির আইন ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
তবে কোনো প্রবাসী আইনি জটিলতায় পড়লে তার ন্যায়বিচার ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রাণ নিরাপদ থাকুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সৌদি আরবে প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী যান বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়। এত বড় শ্রমবাজার ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয়, শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখতে আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা জরুরি।
সৌদি আরবে কত শতাংশ বাংলাদেশি কর্মী কী ধরনের সমস্যায় আছেন, সরকার চাইলে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করতে পারে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিলে সমস্যার সমাধানও সহজ হবে।
সৌদি আরবের শ্রমবাজার আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও কর্মীবান্ধব হোক। প্রবাসীদের জন্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকার আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক: সাহিত্যিক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক



