রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

প্রবাসে সিলেটি ভাষার বিকৃত উপস্থাপন: আমাদের পরিচয় পুনরুদ্ধারের আহ্বান

নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রবাসে সিলেটি ভাষার বিকৃত উপস্থাপন: আমাদের পরিচয় পুনরুদ্ধারের আহ্বান
কোলাজ: ঢাকা মেইল

সিলেটি কেবল একটি উপভাষা নয়—এটি স্বতন্ত্র শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ, সাহিত্য ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আত্মাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা। যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে; এটি আমাদের সম্মিলিত পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।

তবে সিলেটের বাইরে—এমনকি প্রবাসে আমাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেও—এই মূল্যবান ঐতিহ্যকে প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, ক্ষীণ করা হয় ও বিকৃত করা হয়। এই প্রবন্ধে আজকে আমার আলোচনা করার প্রয়াস হবে কীভাবে এই বিকৃতি ঘটছে, কেন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে আমরা সিলেটি ভাষাকে সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

সিলেটি ভাষা নিয়ে কথা বললেই প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—সিলেটি কোনো হাসির ভাষা নয়, কোনো বিকৃত বাংলা নয়, কিংবা শুধু ঘরের ভেতরে কথা বলার একটি আঞ্চলিক রীতি নয়। এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি ভাষা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা নিজেরাই কি সেই ভাষাটিকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিচ্ছি? দেশের বাইরে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সিলেটি ভাষার যে চিত্র অনেক সময় দেখা যায়, তা আমাকে সত্যিই ভাবায়। কারণ সমস্যাটা শুধু বাইরের মানুষের ভুল বোঝাবুঝিতে নয়; অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই সিলেটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছি।

কোথাও সিলেটিকে প্রমিত বাংলার ‘ভুল উচ্চারণ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কোথাও আবার এমন শব্দ, উচ্চারণ ও বাক্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে প্রচলিত সিলেটি ভাষার খুব বেশি মিল নেই। তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে ইংরেজি বা অন্য ভাষার ব্যাকরণ ও কথার ধরন। তারপর সেটিকেই বলা হচ্ছে ‘সিলেটি’।

ভাষা পরিবর্তনশীল—এটা সত্য। প্রবাসে বসবাস করলে ইংরেজির প্রভাব পড়বে, নতুন প্রজন্মের কথাবার্তায় ভাষার মিশ্রণ ঘটবে, সেটিও স্বাভাবিক। কিন্তু ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তন আর ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়—এই পার্থক্যটা আমাদের বুঝতে হবে।

আরেকটি বিষয় আরও দুঃখজনক। অনেক অনুষ্ঠানে বা সামাজিক মাধ্যমে সিলেটি ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেন এটি হাসির খোরাক। সিলেটি বললেই মজার কোনো চরিত্র, কম শিক্ষিত মানুষ কিংবা সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা কারও ছবি তুলে ধরা হয়।

কেন? নিজের ভাষা নিয়ে হাসাহাসি করতে করতে একসময় মানুষ নিজের ভাষাকেই ছোট ভাবতে শুরু করে। আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে আমাদের সন্তানদের ওপর। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা একটি শিশু যদি বারবার শুনতে পায় যে সিলেটি ‘ভালো ভাষা’ নয়, তাহলে সে কেন এই ভাষা শিখতে আগ্রহী হবে? কেন সে তার সন্তানকে শেখাবে?

আমরা সন্তানদের ইংরেজি শেখাচ্ছি, প্রমিত বাংলা শেখানোর চেষ্টা করছি—এটা অবশ্যই দরকার। কিন্তু তার পাশাপাশি নিজের ঘরের ভাষাটাকেও যদি আমরা লজ্জার বিষয় বানিয়ে ফেলি, তাহলে কয়েক প্রজন্ম পর আমাদের নিজেদের কাছেই এই ভাষার অনেক শব্দ, বাক্য ও প্রকাশভঙ্গি হারিয়ে যেতে পারে।

শুধু কথা বললেই ভাষা বেঁচে থাকে না। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমাদের সন্তানরা তো সিলেটি বোঝে’। কিন্তু একটি ভাষা শুধু বোঝার মধ্যে বেঁচে থাকে না। ভাষা বেঁচে থাকে যখন সেই ভাষায় গল্প বলা হয়, কবিতা লেখা হয়, গান গাওয়া হয়, প্রবাদ সংরক্ষণ করা হয়, ইতিহাস বলা হয়, নতুন কিছু সৃষ্টি করা হয়। আমাদের সমস্যা হলো, সিলেটিকে আমরা অনেক সময় পারিবারিক ব্যবহারের মধ্যে আটকে রেখেছি। শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার জায়গায় সিলেটিকে নিয়ে আমাদের উদ্যোগ খুবই সীমিত।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া দরকার। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম রয়েছে। সেখানে সিলেটির স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। এটি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়। বরং নিজের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে স্বীকার করার বিষয়।

পরিবর্তনটা কোথা থেকে শুরু হবে? আমার মনে হয়, প্রথমে আমাদের নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে। সিলেটি বলতে যেন আমরা লজ্জা না পাই। ভুল সিলেটি প্রচার হলে সেটিকে ‘এভাবেই তো সবাই বলে’ বলে এড়িয়ে না যাই। আবার কাউকে সংশোধন করতে গিয়ে অপমানও না করি।

সামাজিক মাধ্যমে কিছু লেখার আগে একটু যাচাই করি। নতুন প্রজন্মকে শুধু সিলেটিতে কথা বলতে বললেই হবে না—তাদের সিলেটি গান শোনাতে হবে, কবিতা ও গল্পের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে, প্রবাদ শেখাতে হবে, আমাদের লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাসের গল্প বলতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সিলেটি ভাষাকে নিয়ে গবেষণা, লেখালেখি ও সংরক্ষণের কাজ বাড়াতে হবে।

কারণ একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না। হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি, পারিবারিক গল্প, লোকজ জ্ঞান, সংস্কৃতির একটি অংশ এবং একটি প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের যোগসূত্র।

তাই প্রশ্নটা শুধু ‘সিলেটি ভাষা থাকবে কি থাকবে না’—এখানে থেমে থাকলে হবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা সিলেটি ভাষাকে কোন অবস্থায় রেখে যেতে চাই? বিকৃত করে? হাসির ভাষা বানিয়ে? নাকি তার নিজস্ব পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে? সিদ্ধান্তটা আমাদেরই।

সিলেটি ভাষাকে সম্মান করা মানে শুধু একটি ভাষাকে সম্মান করা নয়; নিজের শিকড়, ইতিহাস ও পরিচয়কে সম্মান করা। আর এই কাজটি অন্য কেউ এসে করে দেবে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। শুরুটা আমাদের নিজেদের থেকেই করতে হবে।

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, Chief Editor, Thesylhetpost.com

এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর