পৃথিবী শুধু মানুষের বসবাসের জায়গা নয়। এই পৃথিবীতে মানুষের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য প্রাণী, যাদের প্রত্যেকেরই প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পাখির কলতান, প্রজাপতির উড়াউড়ি, নদীতে মাছের বিচরণ কিংবা গাছের ডালে বসে থাকা একটি ছোট্ট পাখি সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃতি পূর্ণতা পায়। অথচ মানুষের স্বার্থ, অসচেতনতা ও নিষ্ঠুর আচরণে প্রতিনিয়ত বিপন্ন হচ্ছে প্রাণিকুল। তাই প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ব প্রাণী দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রতি বছর ৪ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীদের কল্যাণ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে একটি নির্দিষ্ট দিনে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং বছরের প্রতিটি দিনই প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমাদের চারপাশে তাকালেই প্রাণীদের প্রতি অবহেলার নানা চিত্র চোখে পড়ে। খাবারের সন্ধানে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুর-বিড়াল অনেক সময় মানুষের নির্যাতনের শিকার হয়। গরমে কিংবা বৃষ্টিতে আশ্রয়হীন প্রাণীগুলোকে কেউ কেউ তাড়িয়ে দেন, আবার অনেক সময় আহত প্রাণী পড়ে থাকলেও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন না কেউ। অন্যদিকে বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট ও পরিবেশদূষণের কারণে বন্য প্রাণীরা হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল। এসব ঘটনা আমাদের বিবেক ও মানবিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
মানুষের মতো প্রাণীরাও ব্যথা অনুভব করে, ভয় পায় এবং বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। পার্থক্য হলো, তারা নিজেদের কষ্টের কথা মানুষের মতো ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তাই তাদের অসহায়ত্বকে দুর্বলতা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বরং যারা নিজেদের অধিকারের কথা বলতে পারে না, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি।
প্রাণী সংরক্ষণকে অনেকেই শুধু বন্য প্রাণী রক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। গৃহপালিত পশুর যথাযথ পরিচর্যা, পথপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, পাখির বাসা ও ডিম রক্ষা, অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য বন্ধ এবং প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল সংরক্ষণ সবই প্রাণীকল্যাণের অংশ। একটি প্রাণীকে অকারণে আঘাত না করা কিংবা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার দেওয়া ছোট উদ্যোগ মনে হতে পারে। কিন্তু এমন ছোট ছোট মানবিক আচরণই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ শেখানোর কাজ শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকে। শিশুদের বোঝাতে হবে, কোনো প্রাণীকে ভয় দেখানো, পাথর ছুড়ে মারা কিংবা অকারণে কষ্ট দেওয়া সাহসিকতার পরিচয় নয়। বরং অসহায় প্রাণীর পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার দৃশ্য ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এমন ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
আরও পড়ুন
উপমহাদেশে আবার বিতর্কিত জাতপাত প্রথার পদধ্বনি, শঙ্কিত মানুষ
নদী অববাহিকা: নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে
প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ব্যক্তিগত সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ ও কার্যকর আইন প্রয়োগ।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে বিদ্যমান আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আহত ও অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসা, উদ্ধার এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কোনো প্রাণী আমাদের কাছে উপকারী, আবার কোনোটি আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রত্যেক প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর পড়তে পারে। তাই প্রাণী রক্ষা করা মানে প্রকৃতির অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রক্ষা করা।
মনে রাখতে হবে, মানবিকতা শুধু মানুষের প্রতি আচরণে সীমাবদ্ধ নয়; অন্য জীবের প্রতি আমাদের মনোভাবেও তার পরিচয় প্রকাশ পায়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল তার উন্নত ভবন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; বরং সেই সমাজ কতটা সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল, তার মধ্যেও নিহিত। প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ গড়ে তুলতে পারলেই আমরা আরও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে পারব।
আসুন আমরা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করি, সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই এবং মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থানে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি।
লেখক: সংবাদকর্মী




