মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সংকটে বাংলাদেশ: পথ ও প্রত্যাশা

নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

সংকটে বাংলাদেশ: পথ ও প্রত্যাশা
কোলাজ: ঢাকা মেইল

বাংলাদেশ এমন একটি সময় পার করছে, যাকে শুধু আরেকটি রাজনৈতিক সংকট বলে দেখলে হয়তো পুরো বাস্তবতাটা বোঝা যাবে না। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন এসেছে।  কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের সামনে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—দেশ কোন পথে যাবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি কীভাবে ফিরবে?

সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলন, দীর্ঘদিনের সরকারের প্রস্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের গঠন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং তরুণদের মধ্যে হতাশা। ফলে এখন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা না থাকলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যদি প্রতিহিংসা, সংঘাত বা সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত দেশেরই।

তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা দরকার। ক্ষমতায় যে থাকুক বা বিরোধী দলে যে থাকুক, সংবিধান, আইন এবং গণতান্ত্রিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা নয়, বরং যুক্তি ও জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ।

অর্থনীতির দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাধারণ মানুষ এখন বাজারদর, সংসারের খরচ এবং কাজের সুযোগ নিয়ে চিন্তিত। অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও টেকসই হবে না। উৎপাদন বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা, শিল্প ও রপ্তানি বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা তাই জরুরি।

এর পাশাপাশি দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেই হবে না; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অনিয়মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।

তরুণদের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু তাদের সামনে যদি শুধু চাকরির অপেক্ষা থাকে, তাহলে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষতা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান তৈরির অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে এসবের কোনোটিই স্থায়ী হবে না যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হয়। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতেই হবে। জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কিন্তু রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য এটি অপরিহার্য।

উন্নয়নের ধারণাটিও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু বা বড় বড় অবকাঠামো নয়। একজন মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারছেন কি না, তার সন্তান ভালো শিক্ষা পাচ্ছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করতে পারছেন কি না—এসবও উন্নয়নের অংশ।

বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ অনেক। কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। এই সংকটকে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত দেশের ভবিষ্যৎ কোনো এক ব্যক্তি, দল বা সরকারের হাতে নির্ভর করে না। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অংশগ্রহণের ওপর।

বাংলাদেশের মানুষ সংঘাতের চেয়ে শান্তি, বিভাজনের চেয়ে ঐক্য এবং অনিশ্চয়তার চেয়ে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনীতিতে সহনশীলতা, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

সংকট থেকে বাংলাদেশ কোন পথে বেরিয়ে আসবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে পথ যেটিই হোক, সেই পথের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং দেশের স্বার্থ।

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট | চিফ এডিটর, thesylhetpost.com

এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর