রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: মানুষের ওপর বাড়তি চাপ

মো. মাঈন উদ্দীন
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

শেয়ার করুন:

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: মানুষের ওপর বাড়তি চাপ
মো. মাঈন উদ্দীন। ছবি: সংগৃহীত

সরকার প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে নতুন মূল্য কার্যকর করেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। আর পেট্রলের নতুন দাম লিটারে ১৬০ টাকা ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এতে মানুষের ওপর নতুনভাবে চাপ ও প্রভাব পড়েছে। মানুষের আয় ব্যায়ের মধ্যে আরও দূরত্ব বাড়বে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি। যাতায়াত, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।এতে  সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবার কৃষিপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহেয় কৃষকরাও আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন ও নিজস্ব জেনারেটরের জ্বালানি খরচ বেড়ে যাবে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বলা যায় বাড়তি ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা এবং স্থানীয় কারখানার উৎপাদন সচল রাখা কঠিন হচ্ছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই বা কারখানা ছোট করতে বাধ্য হতে পারে।  সরকার গত  ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। পাঁচ মাস আগে বাড়ানো হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। তখন বাসভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা। বেড়েছিল ট্রাকভাড়াও।

পাঁচ মাসে দুই দফায় ডিজেলের মূল্য বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব  অ‌র্থনীতির সব  খাতে পরিলক্ষিত হয়।এতে মানুষের জীবনে বড় ধরনের চাপ পড়ে।  আমরা জানি যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ, পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, জাহাজসহ প্রায় সব যানবাহনই ডিজেলে চলে। কৃষিযন্ত্রের বড় অংশ চালানো হয় ডিজেল দিয়ে। তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে সকল  পরিবহনের বাড়াতো বৃদ্ধি পায় উপরন্তু একে কেন্দ্র করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ও দাম বৃদ্ধি টা একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।                               

অস্বাভাবিকভাবে ভাড়া বৃদ্ধি: তেলের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধির কারণে আমাদের দেশের পরিবহন সেক্টরের ভাড়া বৃদ্ধি টা একটি স্বাভাবিক কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মন্ত্রী ও সরকারি দলের দায়িত্ব শীল ব্যক্তি বর্গ  জনগনের মনের আকাঙ্ক্ষার  বুঝে   সে হিসাবে পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিলো। একসাথে কেজিতে২০ টাকা বৃদ্ধি যা অতীতে সম্ভবত দেখা যায়নি। সরকার বলছে, উপায় না পেয়ে তারা দাম বাড়িয়েছে। উপায় যদি না-ই থাকে, তাহলে  মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করুন। চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের  বাড়াবাড়ি থামানো উচিত।  তেলের দাম বৃদ্ধিতে ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়েছে  ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান এমনকি লঞ্চের ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে হিসাব ছাড়া। মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করে যারা সংসার চালান তাদের একজনের বক্তব্য হলো তেলের দাম বাড়লেও যাত্রীরা বাড়তি টাকা দিতে চান না। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে ভাড়া বেশি নেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাইড শেয়ারিং বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালকেরা দূরত্বভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।এতে যাত্রীরাও পড়ছে বিপাকে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানির কনটেইনার ব্যবস্থাপনায়ও। চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর বিভিন্ন সেবার ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘জ্বালানি সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

জ্বালানির দামের ধাক্কা: চাই স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, এটাই প্রত্যাশিত। গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ যেন বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পারে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি এই মুহূর্তে সরকারের নেই। এত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না । গত আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিলো  ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২২ সাল থেকেই মূল্যস্ফীতির হার উর্ধ্বমুখী। এ সময়ে মানুষের মজুরি যে হারে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি তার কয়েক গুণ বেড়েছে। মূলত মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।

Fuel

বেসরকারি হিসাবে ২০২৫ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিলো ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবে, ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন দারিদ্র্য আরও বাড়বে। এমন একসময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো, যখন সরকার বেশ  সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত  নিয়েছে এতে বাজারে মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।  ফলে জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। এই দুটির সমন্বয়ে আগামী মাসগুলোতে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুতরাং এটি ভোক্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এ মূহুর্তে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা মাথায় রেখে মুদ্রানীতি নিয়েও ভাবা উচিত।  বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, বন্ধ শিল্প সচল করা, এবং মুদ্রানীতিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার মনোভাব সরকারকে নিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে মুদ্রানীতি কঠোর করা   করছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কঠোর অবস্থানে যাওয়া যায় কি না, তা ভাবা উচিত।  

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবনেই খুলে যায়

পণ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়বে: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে  বিভিন্ন শিল্প খাতে ইতিমধ্যে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। ব্যয় সামলাতে পণ্যের দাম কতটুকু বাড়াতে হবে, সেই হিসাব-নিকাশ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তাতে খুব শিগগির প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রড, সিমেন্ট, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদির দাম বাড়তে পারে।এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে। দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের বিক্রি কমে যাবে। ফলে ব্যবসায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে রড, সিমেন্টসহ সব নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়বে। সে ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রী বিক্রিতে মন্দাভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা।

এমনিতেই দেশের অর্থনীতি  নানা সংকটে রয়েছে। এর  মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।  এতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতে তো খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে। তাই সরকারকে জনগনের আয়, ব্যয় এর সাথে সঙ্গতি রেখে  বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।      

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর