শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

উন্নয়ন, সুশাসন ও আত্মনির্ভরতা—কোন পথে বাংলাদেশ?

নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

শেয়ার করুন:

উন্নয়ন, সুশাসন ও আত্মনির্ভরতা—কোন পথে বাংলাদেশ?
কোলাজ: ঢাকা মেইল

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়; বরং এমন একটি উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা, যেখান থেকে দেশ দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই প্রচলিত উন্নয়ন-চক্র ভেঙে বের হতে পারবে?

বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক দেশ একসময় দারিদ্র্য, পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতার মধ্যে আটকে ছিল। কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্পায়ন ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির মাধ্যমে তারা সেই অবস্থান পরিবর্তন করেছে। 

মালয়েশিয়া তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে মালয়েশিয়া শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগোয়নি; দেশটি শিল্পায়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বুঝেছিল একটি দেশকে স্থায়ীভাবে উন্নত করতে হলে শুধু বিদেশি সাহায্য বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করলে হবে না; নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশও গত কয়েক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সূচকে দেশের পরিবর্তন দৃশ্যমান। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ও বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। তবে উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু বড় প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

কারণ একটি রাষ্ট্র যত বড় অবকাঠামোই নির্মাণ করুক, যদি প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, প্রশাসনে বৈষম্য থাকে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অন্ধ আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা অন্য কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু সহযোগিতা আর পরনির্ভরতা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত—বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আপস নয়। কোনো বিদেশি শক্তির অন্ধ অনুসারী হওয়া যেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমনি অন্ধভাবে কোনো দেশকে শত্রু ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো—ভিন্নমতকে সহজেই শত্রুতা হিসেবে দেখা। কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তাকে সরকারবিরোধী, আবার কেউ কোনো দলের সমালোচনা করলে তাকে দলবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা রয়েছে। 

এভাবে একটি জাতি কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। একটি দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন প্রশ্ন করার সাহস, ভুল স্বীকার করার মানসিকতা এবং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার সংস্কৃতি। যে সমাজে সবাই শুধু প্রশংসা করবে, সেখানে ভুলগুলো সময়মতো ধরা পড়ে না। আর ভুল সংশোধন না হলে উন্নয়নের পথও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। তাই জনগণকে অবজ্ঞা করে, তাদের অজ্ঞ বা অযোগ্য বলে দোষারোপ করে কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে—উন্নয়নের বৃত্ত ভাঙা মানে শুধু মাথাপিছু আয় বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করা, যেখানে মেধার মূল্য আছে, যোগ্যতার মূল্য আছে, আইনের শাসন আছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা আছে এবং নাগরিক তার অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে।

বৃত্ত ভাঙতে হলে প্রথমে আমাদের মানসিকতার বৃত্ত ভাঙতে হবে। ভাঙতে হবে অন্ধ দলীয় আনুগত্যের বৃত্ত। ভাঙতে হবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বৃত্ত। ভাঙতে হবে অদক্ষতা ও জবাবদিহিহীনতার বৃত্ত। ভাঙতে হবে বিদেশ-নির্ভর মানসিকতার বৃত্ত। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ভাঙতে হবে সত্য কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা কম নয়। বিশাল জনগোষ্ঠী, তরুণ প্রজন্ম, উদ্যোক্তা শ্রেণি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ চাইলে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা শুধু ক্ষমতায় থাকার চিন্তা করবে না; বরং আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে।

মালয়েশিয়া যদি একসময় তার উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার চেষ্টা করতে পারে, বাংলাদেশও পারবে। তবে অন্য কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করে নয়—নিজস্ব বাস্তবতা, নিজস্ব সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা অন্য কেউ বাংলাদেশকে উন্নত হতে দেবে কি না—শুধু সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ নিজেকে কতটা শক্তিশালী, দক্ষ, সুশাসিত ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।

বৃত্ত ভাঙার ক্ষমতা আমাদের আছে। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জনগণের অংশগ্রহণ এবং সত্যকে সত্য বলার সাহস। বাংলাদেশকে কারও ভৃত্য নয়—নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে হবে।

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, চিফ এডিটর thesyletpost.com 
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অফিসার (আরএম)  Unison UK

এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর