বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে একের পর এক ভারতের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বলি হচ্ছেন, বাংলাদেশের সীমান্তবাসীরা। ২০১০ সালে হিউমান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০-২০১০ মেয়াদকালে এই এক দশকেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের গুলিতে ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যদিও বাস্তবতা আরও ভয়ংকর। কারণ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অনেক বাংলাদেশির লাশ ফেরত দেয় না। আবার কিছু লাশ গুম করে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ দুরূহ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে যখন ভারতীয় মদতপুষ্ট আ. লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন বাংলাদেশি হত্যার সঠিক চিত্র জনগণের সামনে আসে না। কারণ নিয়ন্ত্রিত অনেক মিডিয়া এসব তথ্য প্রকাশ করে না। আবার মিডিয়াকে আ. লীগ ও ভারত স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়াই এতো এতো হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক বিবরণ বিশ্বের দরবারে প্রকাশিত হয় না। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের এমন খুনে স্বভাবের মূল কারণ বাংলাদেশ সামরিক শক্তিতে দুর্বল। এবং মুসলিম দেশ। তাই বাংলাদেশের প্রতি ভারত যতোটা হিংস্র, অপরপক্ষে পাকিস্তানের প্রতি ততোটাই সহনশীল। আর সহনশীল না হয়ে তো উপায়-ও নেই। কারণ, পাকিস্তানের এক বীরযোদ্ধা আয়েশার কাছেই তো ভারত ৬ মিনিট টিকতে পারে না।
বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর একটি গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, ২০১১-২০২০ সময়ে গুলিতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা যথাক্রমে ২১, ৩৮, ১২, ১৩, ৩২, ২৯, ২৫, ১১, ৪১ ও ৫১ জন। অর্থাৎ, সর্বেমোট ২৭৩ জন। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী: ২০২১–২০২৬ সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসফ-এর গুলিতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা যথাক্রমে, ১৬, ১৬, ২৮, ২৫ ও ২৪ জন। সর্বমোট ১০৯ জন। এছাড়াও, ২০২১ সালে মোট ১৮ জন নিহত হলেও ১৬ জন গুলিতে, একজন নির্যাতনে এবং একজন বিএসএফের ধাওয়ার ঘটনায় মারা যান। ২০২২ সালে ২৩ জনের মধ্যে ১৬ জন গুলিতে নিহত হন। ২০২৩ সালে ৩১ জনের মধ্যে ২৮ জন, আর ২০২৪ সালে ৩০ জনের মধ্যে ২৫ জন গুলিতে নিহত হন। ২০২৫ সালে মোট ৩৪ জন নিহত হন; এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে বিএসএফ-সংশ্লিষ্ট সীমান্ত সহিংসতায় ১০ বাংলাদেশি নিহত হন। এর মধ্যে ৭ জন গুলিতে এবং ৩ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান। এরপর মে মাসেই আরও তিনজন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২ জন এবং লালমনিরহাটে ১ জন। তবে এগুলো আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জানুয়ারি-জুনের ৭ জনের হিসাবের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নেওয়া যায়, কারণ জুনের প্রতিবেদনটি ছয় মাসের পূর্ণ সময়ের হিসাব।
সুতরাং ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ১০৯ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আসক-এর হিসাবে গুলিতে নিহত আরও ৭ জন, ফলে ২০২১–জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট অন্তত ১১৬ জন। আজ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য সংবাদ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বিএসএফের গুলিতে অন্তত ২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তা হলো: ১২ সেপ্টেম্বর, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অপরদিকে ২০১০-২০২০ বা ২০২১-২০২৬ সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত পাকিস্তানি বেসামরিক নাগরিকের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ভারত বাংলাদেশের মানুষকে পাখির মতো হত্যা করলেও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা করে না। এর মূল কারণ হলো পারমাণবিক প্রতিরোধ ও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি। ভারত ও পাকিস্তান দুটোই পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং তাদের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে। ফলে সীমান্তে ছোট একটি ঘটনা দ্রুত বড় সামরিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতেও কয়েক দিনের মধ্যে দুই পক্ষের বিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পর্যায়ে পরিস্থিতি গিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের অব্যাহত হুমকির কারণে ভারত পিছিয়ে যায়। আরেকটি বিষয় হলো, পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে ভারতের প্রচলিত সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভারসাম্য তৈরির একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ ও ভারত পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের ইতিহাসও নেই। সীমান্তের বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ এবং সীমান্তের দুই পাশে মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য রয়েছে। ফলে বিএসএফের স্থানীয় সীমান্ত-নিরাপত্তা অভিযান এবং সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায়ই একই ভৌগোলিক এলাকায় পড়ে। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেনো ভারত পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিশোধের ঝুঁকির কারণে পাকিস্তান সীমান্তে বেশি সতর্ক। আর বাংলাদেশ সীমান্তে সেই কৌশলগত ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে ভারতের প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনা বেশি। তাই ভারত বাংলাদেশকে ভয় পায় না। এবং নির্বিচারে বাংলাদেশিকে হত্যা করে। তবে পাক-ভারত সীমান্তের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অসমতা, সীমান্তের ধরন, চোরাচালান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতি, জবাবদিহিতা এবং ভারত-পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ, এ সবগুলো বিষয় একসঙ্গে প্রভাব বিস্তাকারী।
আরও পড়ুন
২৪ জেলার সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে মাদক
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তজুড়ে মাদকের সাম্রাজ্য, ৩ উপজেলা ঘিরে পাচারের জাল
বাংলাদেশ-ভারত প্রায় ৪ হাজার ৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের সাথে যুক্ত। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সীমানা নয়। এটি দুই দেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও আত্মীয়তার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। বহু মানুষ প্রতিদিন কৃষিকাজ, ব্যবসা ও জীবিকার প্রয়োজনে সীমান্তের কাছাকাছি চলাচল করেন। কিন্তু একই সীমান্ত বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে দেখছে, প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। এবং তা কেবল ভারত দ্বারাই সংঘঠিত হচ্ছে।
মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে বিএসএফ। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে। আছে একজন বাবা, মা, সন্তান বা স্বজন। ফেলানী খাতুনের মৃত্যু সেই বাস্তবতার একটি গভীর ও বেদনাদায়ক স্মৃতি। ২০১১ সালে সীমান্তের কাঁটাতারে তাঁর মরদেহ ঝুলে থাকার ছবি বাংলাদেশে সীমান্ত হত্যার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। এরপরও একই ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভারতের বক্তব্যে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত অপরাধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিএসএফের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই গুলি চালানো হয়েছে। এটি একটি অযুহাত। ভারত প্রচন্ড মিথ্যাচারকারী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। তারা তাদের দেশের জঙ্গি হিন্দুকে জঙ্গি না বললেও, মুসলমানদের সারাক্ষণ জঙ্গি তকমা দিতে থাকে।
সীমান্তে অপরাধ একটি বাস্তব সমস্যা। কিন্তু অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনের চোখে অপরাধী নন। মানবাধিকারের মৌলিক নীতিও এখানেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে নির্বিচারে গুলি, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ উঠে এসেছে। এই সংস্থাটির ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরীহ মানুষের উপর বিএসএফ কর্তৃক বহুক্ষেত্রে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে। এবং ভারতের তরফ হতে বিএসএফ এর অপকর্মের কার্যকর তদন্ত ও শাস্তির অভাব রয়েছে।
তাই ভারতকে শক্ত ভাষায় জানিয়ে দেওয়া দরকার যে, সীমান্তে মানুষ হত্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ। সাথে সাথে এই কুখ্যাত সীমান্ত হত্যা থেকে উত্তরণের পথও খুঁজতে হবে, বাংলাদেশকে। প্রথমত, দুই দেশকে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। কোনক্রমেই গুলি করে মানুষ হত্যা করা যাবে না। প্রয়োজনে গ্রেফতার করে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রয়োজন। শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত যথেষ্ট নয়। গুরুতর অভিযোগ থাকলে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও ভারতকে নিয়মিতভাবে যৌথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো বাংলাদেশি নিহত হলে তার পরিবার যেন তথ্য, তদন্তের অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারে। একই নীতি ভারতীয় নাগরিকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। চতুর্থত, সীমান্তের দরিদ্র মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতি নিয়েও কাজ করতে হবে। শুধু কাঁটাতার, পাহারা ও অস্ত্র দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য বৈধ বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সহজ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বাড়ানো প্রয়োজন। এতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ দিতে হবে।
তবে সবকিছুর আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। নিরাপত্তা সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানুষের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষাও প্রয়োজন। একটি দেশের নিরাপত্তা অন্য দেশের মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করে টেকসই হতে পারে না। সীমান্তে একটি মৃত্যু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ছোট ঘটনা নয়। একটি গুলি সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে মানুষের মনে পৌঁছে যায়। তাই সীমান্তকে শুধু নিরাপত্তার রেখা হিসেবে নয়, মানবিকতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও দেখতে হবে। শূন্য সীমান্ত হত্যা শুধু একটি কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। এটি ভারতের ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব।
লেখক: কবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক




