রাজনীতিতে সমর্থন থাকবে, মতাদর্শ থাকবে, দলীয় আনুগত্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় আনুগত্য কখনোই বিবেক, যুক্তি ও সত্য বলার সাহসকে হত্যা করতে পারে না। বরং একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তিনি নিজের দলকে ভালোবাসেন, কিন্তু দলের ভুলকে ভুল বলার সাহসও রাখেন।
প্রশ্ন হলো—গঠনমূলক সমালোচনার যোগ্যতা কি সবার আছে? আমার বিশ্বাস, সমালোচনা করা যতটা সহজ, গঠনমূলক সমালোচনা করা ততটাই কঠিন। কারণ গঠনমূলক সমালোচনার জন্য প্রয়োজন বিবেক, যুক্তিবোধ, নৈতিক সাহস এবং নিজের অবস্থানকেও একই মানদণ্ডে বিচার করার মানসিকতা।
আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন একজন কর্মী হিসেবে আমি দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অনিয়ম, বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক ভুল-ত্রুটি নিয়ে লেখনীর মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করেছি।
উদ্দেশ্য ছিল কাউকে হেয় করা নয়; বরং দল ও রাষ্ট্রের ভালো চাওয়া। আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আছেন, তাদের কর্মকাণ্ড নিয়েও একইভাবে প্রশ্ন তুলছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোথায় সফলতা আছে, কোথায় ব্যর্থতা আছে, কোথায় বৈষম্য হচ্ছে, সাধারণ মানুষ কোথায় বঞ্চিত হচ্ছে—এসব বিষয় নিয়েও গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করা একজন সচেতন নাগরিকের অধিকার এবং দায়িত্ব।
দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন সবকিছু ভালো—আর দল ক্ষমতার বাইরে গেলে সবকিছু খারাপ; এই মানসিকতা গঠনমূলক রাজনীতি নয়। রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো ‘দলান্ধতা’। দলান্ধ ব্যক্তি সত্যকে সত্য হিসেবে দেখেন না; তিনি দেখেন দলীয় চশমা দিয়ে। নিজের দলের ভুল হলে তিনি যুক্তি খুঁজে বের করেন, আর প্রতিপক্ষের একই ভুল হলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই দ্বৈত মানসিকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।
গঠনমূলক সমালোচনা মানে কাউকে অন্ধভাবে আক্রমণ করা নয়। গঠনমূলক সমালোচনা হলো—সমস্যা চিহ্নিত করা, বাস্তবতা তুলে ধরা এবং সমাধানের পথ দেখানো। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে এবং ভুল কাজের সমালোচনা করতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কোনো একটি দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের।
যদি কোনো সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে বৈষম্য দেখা যায়, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল হয়, তাহলে তার সমালোচনা করতেই হবে। একইভাবে অতীতে নিজের সমর্থিত দলের কোনো ভুল থাকলে সেটিও স্বীকার করতে হবে। নীতির প্রশ্নে অবস্থান এক হওয়া উচিত—কে করছে সেটা নয়, কী করছে সেটাই আসল প্রশ্ন।
যারা নিজেদের দলের ভুলের সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, তারা অন্যের ভুলের সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার কতটুকু রাখেন—সেটিও ভেবে দেখা দরকার।
আমি কোনো দলের অন্ধ সমর্থক হতে চাই না। আমি চাই, রাজনীতি হোক যুক্তিনির্ভর, রাষ্ট্র পরিচালনা হোক জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের অধিকার হোক সবার আগে।
আমার লেখার উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়। উদ্দেশ্য হলো প্রশ্ন তোলা, আলোচনা সৃষ্টি করা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। আজ যারা ক্ষমতায়, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে আজ যারা ক্ষমতায়, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে। গতকাল যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের ভুলও বলতে হবে। আর ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে। কারণ সত্য কোনো দলের একার সম্পত্তি নয়। ন্যায়বিচার কোনো দলের দলীয় সম্পত্তি হতে পারে না। আর গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকারও শুধু সুবিধামতো সময়ে ব্যবহার করার বিষয় নয়।
বাংলাদেশে যে মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল, সেই মন্ত্রিসভাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে—এমন সমালোচনা ও প্রশ্ন জনপরিসরে দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের একটি অংশ এখনো সঠিক পথ ও প্রত্যাশিত পরিবর্তনের সন্ধান করছে।
দেশজুড়ে বৈষম্য, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় আনুগত্যের প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সরকার দলীয় আনুগত্যের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে বলে মনে হলে রাষ্ট্র পরিচালনা কতটা ফলপ্রসূ হবে সেই প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে প্রশ্ন উঠবেই, নির্বাচন বা ক্ষমতায় আসার সময় জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা পূরণ না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এটি যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে দলীয় বিবেচনা যদি জনস্বার্থের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে বৈষম্য, সুবিধাবাদ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা সৃষ্টি হতে পারে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসতে পারে।
যখন জনগণ নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ হতে দেখে না, তখন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবশ্যই বিষয়টি একপাক্ষিক নয়। কারও মতে বর্তমান সরকার কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে; আবার অন্যরা বৈষম্য ও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলছেন। তাই উভয় পক্ষের যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।
গণতন্ত্রে চাপ ও ভারসাম্য জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো কার্যকর চাপ ও ভারসাম্য। একটি সুস্থ গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারকে সরকারি দলের ভেতর থেকেও এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সমালোচনাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই চাপ ও জবাবদিহিতাই সরকারকে আরও স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং জনকল্যাণমুখী হতে উৎসাহিত করে। চাপ নেই, প্রশ্ন নেই, জবাবদিহিতা নেই—তাহলে স্বচ্ছতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
শেষ কথা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি বিবেক ও নীতির প্রতি আনুগত্য। রাজনীতিতে আনুগত্যের চেয়ে বিবেক বড়।
ব্যক্তির চেয়ে নীতি বড়। আর দলের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বড়।এই বোধ তৈরি না হলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই সমালোচনা হোক যুক্তির ভিত্তিতে। প্রতিবাদ হোক নীতির ভিত্তিতে।
প্রশ্ন হোক তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। আর রাজনীতি হোক জনগণের স্বার্থে। কারণ ক্ষমতায় কে আছে, সেটি সাময়িক; কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণ—তারাই স্থায়ী।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, চিফ এডিটর thesyletpost.com
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অফিসার (আরএম) — Unison
এআরএম




