কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি দুর্নীতি বা দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বা এ ধরনের অপরাধ করেছে— এই অভিযোগ বা এমনকি প্রমাণিত অপরাধের মানে এই নয় যে, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো, কাউকে তার মৌলিক অধিকার থেকে বিচার ব্যতীত বঞ্চিত করা যাবে না।
দুর্নীতি একটি মারাত্মক অপরাধ, তার জন্য অবশ্যই দায়বদ্ধতা নিরূপণ, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে— কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সংবিধানসম্মত।
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, বিচার অপরিহার্য। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী রাষ্ট্রের আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান এবং আইনের সাহায্যে সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
অনুচ্ছেদ ৩৭, ৩৯ ও ৪০ অনুযায়ী— সংগঠন গঠন করা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ করা, সভা-সমাবেশ করা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রার্থী হওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করেই সীমিত বা স্থগিত করা যেতে পারে— কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বা কারো ইচ্ছানুযায়ী নয়।
এটা সত্য যে, দুর্নীতি দেশের জন্য ক্ষতিকর, জনগণের আস্থা নষ্ট করে এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু কোনো দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই বা অতীতে কোনো অনিয়ম হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেলেই তাদের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেওয়া— তা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।
অভিযোগ ও প্রমাণ এক নয়; সম্পৃক্ততা ও দোষী সাব্যস্ততা পৃথক বিষয়। কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার আগে তাকে ন্যায্য শুনানির সুযোগ দিতে হবে, স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে এবং নিরপেক্ষ আদালতের মাধ্যমে বিচার করতে হবে।
অপরাধ ও দণ্ড পৃথক বিচারের দাবিদার।.কোনো ব্যক্তি বা দলের সদস্য আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হলে সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে— জরিমানা, কারাদণ্ড বা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা বাতিল করা পর্যন্ত।
কিন্তু সেই শাস্তিও হতে হবে আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যে এবং ব্যক্তিগত— সম্পূর্ণ দলটিকে একত্রে দোষী সাব্যস্ত করে তার রাজনৈতিক অস্তিত্বই বাতিল করে দেওয়া যায় না, যদি না সেই দলের লক্ষ্য ও কার্যক্রম সংবিধানবিরোধী বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়— এবং সেটাও প্রমাণসাপেক্ষ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে হবে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নীতি, কর্মসূচি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে— পরস্পরকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা নয়। যখন কোনো দলকে বিচার ব্যতীত নিষিদ্ধ বা ক্ষমতাহীন করা হয়, তখন তা কেবলমাত্র ওই দলটিরই নয়, বরং সমগ্র দেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকে সংকুচিত করে, কারণ জনগণের বিকল্প মতামত শোনার ও বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়।
দুর্নীতি অবশ্যই নিন্দনীয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সেই সংগ্রামকে কখনোই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি— এই হলো গণতন্ত্রে দুর্নীতির মোকাবিলা করার সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পথ। কাউকে বিচার ছাড়াই তার রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা দুর্নীতির চেয়েও কম ক্ষতিকর নয়— কারণ তা প্রতিষ্ঠা করে স্বেচ্ছাচারের শাসন, আইনের নয়।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট , চিফ এডিটর thesylhetpost.com
এআরএম




