কিছু মানুষের জীবনকে শুধু জীবনী বলা যায় না। জীবনীতে জন্মতারিখ থাকে, শিক্ষার বিবরণ থাকে, চাকরি থাকে, পদ-পদবি থাকে। কিন্তু মানুষের আসল জীবন লেখা থাকে অন্য জায়গায়—সে কতবার ভেঙেছে, কতবার উঠে দাঁড়িয়েছে, কতটা অন্ধকার পেরিয়েছে এবং সেই অন্ধকারের মধ্যেও তার ভেতরের আলোটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে কি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তেমন একজন মানুষ।
তার জীবনের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চার দশকের রাজনীতির অনেকগুলো দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আইনজীবী, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব, সরকারি চাকরি ছেড়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে আসা তরুণ নেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, কক্সবাজারের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন জনপ্রতিনিধি, বিএনপির মুখপাত্র, কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতা, গুমের শিকার মানুষ, শিলংয়ের নির্বাসিত নাগরিক, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য—সবশেষে জনগণের ভোটে ফিরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
একজন মানুষের জীবনে এতগুলো পরিচয় খুব বেশি আসে না। আর এ কারণেই সালাহউদ্দিন আহমদকে তার পদ দিয়ে নয়, তার পথ দিয়ে বিচার করা উচিত। তাকে আমি চিনেছি তার রাজনৈতিক জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে আমরা চার বছরেরও বেশি সময় সহকর্মী ছিলাম। তিনি আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র। কাজের ধরনও ছিল প্রায় একই। কর্মক্ষেত্রে তাঁকে দেখেছি প্রচণ্ড কর্মঠ একজন মানুষ হিসেবে। আর ব্যক্তিগত ব্যবহারে ছিলেন অতিশয় সজ্জন।
এই ব্যক্তিগত স্মৃতিটির কথা বলছি কারণ পরে তার রাজনৈতিক জীবনে যত ঝড় এসেছে, সেই ঝড়ের মধ্যে মানুষটিকে চিনতে আমার জন্য এই স্মৃতিই সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থেকেছে।
১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের কোনো একদিনের কথা। তিনি আমাকে বললেন, “আমি ইলেকশন করবো। আমার রেজিগনেশন একদিনের মধ্যে একসেপ্ট করিয়ে দিতে পারবে?” আমি বললাম, পারব। তবে তাকে একটি পরামর্শও দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বিরোধী দলের বয়কটের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিয়ে রাজনীতি শুরু না করাই ভালো। আমার যুক্তি ছিল খুব সরল—যে নির্বাচনে শক্ত প্রতিপক্ষ নেই, সেই নির্বাচনে জিতলে সংসদে যাওয়া যায় বটে, কিন্তু বড় রাজনৈতিক লড়াই সম্পর্কে অজানাই থেকে যেতে হয়।
তখন কে জানত, জীবনের পরবর্তী লড়াইগুলো কোনো সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও কঠিন হবে! তার সরকারি চাকরি ছাড়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। একজন বিসিএস কর্মকর্তা, যার সামনে প্রশাসনিক জীবনের নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছিল, তিনি সেটি ছেড়ে চলে গেলেন নির্বাচনের মাঠে।
রাজনীতিতে নিরাপদ রাস্তা বলে কিছু নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশে। তিনি নির্বাচনে গেলেন। সংসদ সদস্য হলেন। কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি হলেন। মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর হলো। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। চারদলীয় জোট সরকারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন এবং পূর্ণ মেয়াদে কাজ করলেন।
তার সিনিয়র ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। মন্ত্রণালয়ের নানা জটিলতার কারণে সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্বও সবসময় সহজ ছিল না। কিন্তু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, কর্মক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে তিনি প্রতিমন্ত্রী হয়েও অনেক বেশি দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়ে ওঠেন।
কক্সবাজার তখন তার রাজনীতির কেন্দ্র।
কক্সবাজার শুধু সমুদ্র আর পর্যটনের শহর নয়। তার পেছনে আছে বিশাল গ্রামীণ জনপদ, উপকূল, পাহাড়, নদী, বিচ্ছিন্ন জনবসতি এবং যোগাযোগের দীর্ঘ সংকট। একটি জেলার উন্নয়ন কেবল কয়েকটি বড় প্রকল্প দিয়ে হয় না; রাস্তা লাগে, সেতু লাগে, উপজেলা লাগে, প্রশাসনিক কাঠামো লাগে, মানুষের চলাচলের সুযোগ লাগে।
পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্থায়ী অর্জন। বৃহত্তর চকরিয়ার ভেতর থেকে পেকুয়াকে পৃথক প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা একটি এলাকার মানুষের প্রশাসনিক পরিচয় ও উন্নয়নের সুযোগকে নতুন ভিত্তি দেয়। সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, উপকূলীয় এলাকার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিভিন্ন সড়ক ও সেতু নির্মাণ—এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারের অনেক এলাকার চেহারা বদলাতে শুরু করে।
রাজনীতিবিদদের উন্নয়নের গল্প অনেক শুনেছি আমরা। নির্বাচনের আগে রাস্তা হয়, সেতু হয়, কালভার্ট হয়, এমনকি কখনও কখনও কাগজে নদীর ওপর সেতুও হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক বছর পর জনগণ সব হিসাব মেলাতে বসে।
সালাহউদ্দিন আহমদের ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিচার করতে হলে কক্সবাজারের মানুষের স্মৃতি ও বাস্তবতার কাছেও যেতে হবে। তবে তার জীবনের গল্প শুধু উন্নয়নের গল্প নয়। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর মামলা-মোকদ্দমা ও কারাবাস তার জীবনের অংশ হয়ে এল। ২০০৯ সালের নির্বাচনে তার পরিবর্তে তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত হলেন। আর সালাহউদ্দিন আহমদ ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনীতি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে উঠে এলেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হলেন। পরে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পেলেন। মুখপাত্রের কাজ বাইরে থেকে খুব সহজ মনে হয়। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাইক্রোফোন কখনও কখনও খুব ভারী জিনিস। কারণ আপনি যা বলছেন, সেটি শুধু আজকের সংবাদ নয়; কাল সেটি দলের রাজনৈতিক অবস্থানের দলিলও হয়ে যেতে পারে।
সালাহউদ্দিন সেই কঠিন সময়েই বিএনপির অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।২০১৫ সালের মার্চে তার জীবনে এল এমন একটি ঘটনা, যা তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দিল। তিনি নিখোঁজ হলেন।
একজন মানুষ হঠাৎ করে নিজের বাড়ি থেকে, নিজের পরিবার থেকে, নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
তখন আমি লিখেছিলাম—সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। গত একসপ্তাহ ধরে উনার কোনো খোঁজ মিলছে না। আজ এত বছর পরে সেই লেখাটি ফিরে পড়লে মনে হয়, তখন আমরা জানতাম না এই অন্ধকার কত দীর্ঘ হবে। পরিবার অপেক্ষা করছিল। দল অপেক্ষা করছিল। দেশ অপেক্ষা করছিল। পরে তাকে পাওয়া গেল ভারতের শিলংয়ে। শুরু হলো নির্বাসনের নয় বছর।
শিলংয়ের সেই রাতগুলো এই জায়গাটিতে এসে আমার নিজের স্মৃতির কথা না বললে সালাহউদ্দিন আহমদের নির্বাসিত জীবনের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গুমের পর তার শিলংয়ের নয় বছরের নির্বাসিত জীবনে রাত্রিবেলায় আমি ছিলাম তার নিত্যকার সঙ্গী। সপ্তাহের অন্তত অর্ধেক দিন আমাদের কথা হতো।
লম্বা আলোচনা: রাজনীতি নিয়ে, আন্দোলন নিয়ে, সংগ্রাম নিয়ে, কে কোথায় আছে, রাজনীতিতে কী হচ্ছে, ম্যাডামের কী অবস্থা, দেশের পরিস্থিতি কী, স্বৈরাচারী সরকার কবে যাবে, দেশ কবে মুক্ত হবে, আমেরিকা কী ভাবছে স্যাংশন হবে কি না, আন্দোলন কোন পথে চালানো যায়, দলের কোন নেতা কোথায় আছেন। কোন কর্মসূচির কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।
কখনও মনে হতো, সালাহউদ্দিন শিলংয়ে আছেন, কিন্তু তার মন পড়ে আছে ঢাকায়।নির্বাসনের সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো দেশ থেকে দূরে থাকা নয়। দেশের প্রতিটি খবরের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখে দেশে ফিরতে না পারা। আমরা রাতের পর রাত কথা বলেছি। কখনও রাজনীতি বিশ্লেষণ করেছি, কখনও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেছি, কখনও হতাশ হয়েছি, আবার কখনও এমন আশাবাদী হয়েছি যেন পরদিন সকালেই সবকিছু বদলে যাবে।
একবার তিনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন। কথার মধ্যে আবেগ চলে এলো।
বললেন, এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেড বডিটা তুমি নিয়ে যেও। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিও। পরিবারের দিকে খেয়াল করো। একজন মানুষ যখন নিজের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব বন্ধুর হাতে তুলে দিতে বলেন, তখন তার ভেতরের নিঃসঙ্গতাটা কল্পনা করা কঠিন।
আমি তাকে উল্টো কথা বলেছিলাম।বলেছিলাম, আপনি এভাবে কথা বলবেন না। আপনি নিশ্চয়ই দেশে ফিরবেন। আবার রাজনীতি করবেন। এমপি হবেন। মন্ত্রী হবেন। দেশ চালাবেন। দলের দায়িত্ব নেবেন। আমার কথায় তিনি আমাকে একটু মৃদু বকেছিলেন। সম্ভবত তার মনে হয়েছিল, আমি বাস্তবতা বুঝছি না।
কিন্তু আমি তখনও বিশ্বাস করতাম—এই মানুষটি দেশে ফিরবেন। শুধু জানতাম না, কবে। সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। সে কখনও কখনও মানুষের বিশ্বাসকে পরীক্ষা নেয়, আবার কখনও অসম্ভব বলে মনে হওয়া কথাকেও সত্যি করে দেয়।
ভারতের আদালতে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেন। খালাস পেলেন। কিন্তু আইনি মুক্তি পেলেও দেশে ফেরার রাজনৈতিক দরজা তখনও পুরোপুরি খোলেনি।
নয় বছর কেটে গেল।
একটি শিশুর শৈশব পেরিয়ে যায় নয় বছরে।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রজন্ম বদলে যায় নয় বছরে।
একটি দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায় নয় বছরে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই হলো।
“এখন নয়, আপনি ফিরবেন হাসিনা পালানোর পর”
২০২৪ সালের নির্বাচন সামনে এলো। বিএনপি নির্বাচনে গেল না। নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট কাটল না। নির্বাচনের পর একসময় সালাহউদ্দিন দেশে ফিরতে চাইলেন। ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে বাধা দিয়েছিলাম। বলেছিলাম—এখন নয়।
আপনি অবশ্যই দেশে ফিরবেন। কিন্তু সেই দিনটি হবে যেদিন হাসিনা পালাবে। আমি তাকে আরও বলেছিলাম—সেই দিন খুব শিগগির আসছে। কেউ তখন হয়তো এই কথাকে আবেগ বলতেন। কেউ হয়তো অতিরিক্ত আশাবাদ। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও মানুষের রাজনৈতিক হিসাবের চেয়েও দ্রুত চলে।
তারপর এল জুলাই।
ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হলো। আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র আন্দোলনের সীমা অতিক্রম করে গণআন্দোলনের রূপ নিল। দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো।
বিএনপির পক্ষ থেকেও আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় চলল। নির্বাসনে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদ ও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আন্দোলনের গতিপথ, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে সক্রিয় ছিলেন।
৫ আগস্ট ২০২৪। আমার দেওয়া তারিখ ৩৬ জুলাই।
যে দিনটির কথা আমি শিলংয়ের সেই রাতগুলোর একটিতে তাকে বলেছিলাম, সেই দিন এসে গেল।
হাসিনা দেশ ছাড়লেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো। আর দীর্ঘ নয় বছর পর সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফিরলেন। তখন মনে হয়েছিল, শিলংয়ের সেই রাতগুলোর সঙ্গে যেন ঢাকার সকালের একটা হিসাব মিলে গেল।
আমি হয়তো তাকে বলতে পারতাম—আমি তো বলেছিলাম, আপনি ফিরবেন। কিন্তু কিছু কথা মুখে বলার দরকার হয় না। মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেখানে নীরবতাই সবচেয়ে বড় বাক্য।
নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রচিন্তায়
দেশে ফিরে সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে আরেকটি নতুন অধ্যায় খুলে গেল। সরকার বদলেছে। কিন্তু সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র সংস্কার করতে হয়।
প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে হয়। সংবিধান নিয়ে ভাবতে হয়। গণতন্ত্রকে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে হয়।
জুলাই সনদ, সংবিধান সংশোধন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং নির্বাচিত সংসদের ভূমিকা নিয়ে যে জাতীয় বিতর্ক শুরু হলো, সেখানে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এখানে তার আইনজীবী পরিচয় এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজে লাগে।
রাজপথে পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন লাগে।
কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে লাগে আইন। স্লোগান দিয়ে সরকার পরিবর্তন করা যায়; কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে টেকসইভাবে পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, আইন, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের সম্মতি। সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক চিন্তায় এই জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি রাষ্ট্রকে দূর থেকে দেখেননি। রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেছেন। প্রশাসনে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করেছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠিন দিকেরও শিকার হয়েছেন। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাকে অন্য অনেক রাজনীতিকের চেয়ে আলাদা করে।
আবার সংসদে, এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ভোটে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন। এ যেন তার জীবনের এক আশ্চর্য বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়া।
একসময় তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন—রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করতেন।পরে মন্ত্রী ছিলেন—রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। তারপর বিরোধী দলের মুখপাত্র হয়েছেন—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমালোচনা করেছেন। তারপর নিজেই সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠিনতম রূপের শিকার হয়েছেন। গুম হয়েছেন। নির্বাসনে থেকেছেন। আর আজ সেই মানুষটির হাতেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব। ইতিহাস মাঝে মাঝে সত্যিই অসাধারণ রসিকতা করে। তবে এই রসিকতার ভেতরে একটি গভীর দায়িত্বও আছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু পুলিশ, র্যাব কিংবা আইনশৃঙ্খলার মন্ত্রণালয় নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তার মন্ত্রণালয়। নাগরিকের অধিকার রক্ষার মন্ত্রণালয়। আইনের শাসনের মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কতটা ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে—তারও একটি বড় পরীক্ষা। যে মানুষ নিজেই একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্ধকার দিক অনুভব করেছেন, তার কাছে মানুষের প্রত্যাশাটাও তাই একটু বেশি।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? সালাহউদ্দিন আহমদের জীবনের বড় অর্জনের তালিকা করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র হওয়া। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ওঠা। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করা। সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা। বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া। যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালন। পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। কক্সবাজারের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করা। বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে কঠিন সময়ে দলকে প্রতিনিধিত্ব করা। কারাবরণ করা।
গুমের শিকার হওয়া। নয় বছর নির্বাসনে থেকেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া। জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা। এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটে ফিরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া। কিন্তু সবকিছুর ওপরে তার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত একটি অন্য জিনিস। তিনি নিজেকে হারাননি।
গুম তাকে হারাতে পারেনি। নির্বাসন তাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। দীর্ঘ অপেক্ষা তাকে নিরাশার মানুষে পরিণত করতে পারেনি। কারাবাস তার রাজনৈতিক বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারেনি। ক্ষমতার বাইরে থাকার বছরগুলো তাঁকে রাজনৈতিকভাবে মুছে দিতে পারেনি। তিনি ফিরে এসেছেন। শুধু দেশে নয়—জনগণের কাছে ফিরে এসেছেন। আর জনগণ তাকে আবার ভোট দিয়েছে। এই জায়গাটির রাজনৈতিক মূল্য অনেক বড়।
ভবিষ্যতের বিএনপি বিএনপির সামনে এখন একটি নতুন সময়। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। আন্দোলনের রাজনীতি জানলেই রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি জানা হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। প্রয়োজন আইন ও সংবিধানের জ্ঞান।প্রয়োজন সংসদীয় দক্ষতা। প্রয়োজন রাজনৈতিক সংগঠন বোঝার ক্ষমতা। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বোঝা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—ক্ষমতার সীমা বোঝা। সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে এই অভিজ্ঞতাগুলোর একটি বিরল সমন্বয় রয়েছে।তিনি আমলা ছিলেন। তিনি আইনজীবী। তিনি ছাত্রনেতা। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তিনি মন্ত্রী। তিনি বিরোধী দলের মুখপাত্র। তিনি আন্দোলনের সংগঠক। তিনি গুমের শিকার। তিনি নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতা। এবং এখন তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: শনিবার আছে, সমস্যার ছুটি নেই
বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তার এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা একটি বড় সম্পদ হতে পারে। রাষ্ট্র সংস্কার, সাংবিধানিক প্রশ্ন, সংসদীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দলীয় নীতি নির্ধারণ—এই বৃহত্তর পরিসরে তাকে আরও বড় দায়িত্বে কাজে লাগানো বিএনপির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ বিএনপির সামনে এখন শুধু একটি নির্বাচন জেতার প্রশ্ন নেই।
প্রশ্ন হলো—একটি নতুন রাজনৈতিক সময়কে কীভাবে একটি কার্যকর রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া যায়। ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্রকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখা যায়। আইনের শাসনকে কীভাবে বাস্তব করা যায়। প্রতিপক্ষের অধিকারকে কীভাবে সম্মান করা যায়।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যে অন্ধকার বাংলাদেশের রাজনীতিকে একসময় গ্রাস করেছিল, সেখানে যেন আর কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়। সালাহউদ্দিন আহমদের নিজের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাকে এই কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত করেছে।
শেষ কথা
শিলংয়ের সেই রাতগুলো এখন ইতিহাস। কিন্তু আমার কাছে সেগুলো শুধু ইতিহাস নয়—ব্যক্তিগত স্মৃতি। একজন নির্বাসিত মানুষ ফোনের ওপারে।
দেশের খবর জানতে চাইছেন। রাজনীতির হিসাব করছেন। আন্দোলনের পথ খুঁজছেন। কখনও হতাশ। কখনও আশাবাদী।
তারপর এক রাতে বললেন—
এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেড বডিটা তুমি নিয়ে যেও। আমি বলেছিলাম—আপনি ফিরবেন। আবার রাজনীতি করবেন। এমপি হবেন। মন্ত্রী হবেন। দেশ চালাবেন। তখন কথাটি ছিল বিশ্বাস। আজ তার কিছুটা বাস্তবতা। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
দেশে ফিরে আসা তার জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। এখন শুরু হয়েছে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়—ক্ষমতার ভেতর থেকে সেই রাষ্ট্রকে বদলানোর চেষ্টা, যে রাষ্ট্রের অন্ধকার একদিন তাঁকেই গিলে খেতে চেয়েছিল।
সাফল্যের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা হয়তো এটাই— যে অন্ধকার আপনাকে একদিন গ্রাস করতে চেয়েছিল, ফিরে এসে আপনি যেন সেই অন্ধকার আর কাউকে গ্রাস করতে না দেন। সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে এখন সেই সুযোগ।
শিলংয়ের নয় বছরের রাতের যদি কোনো উত্তর থাকে, সেটি পদ-পদবিতে নয়। এটি এমন বাংলাদেশ— যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আর বলতে হবে না, “আমার ডেড বডিটা নিয়ে যেও।”
এআরএম




