বাংলাদেশ সপ্তাহ শুরু করেছে সেই চিরপরিচিত আশাবাদ নিয়ে। যে আশাবাদে একটু সতর্কতা মেশানো থাকে। যেমন- বাঙালি বিয়ের দাওয়াতে মাংসের হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে: আশা আছে, কিন্তু আগে দেখে নিতে হবে হাঁড়িতে সত্যিই মাংস আছে কি না।
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, ঢাকার নদী-খালগুলোকে বাঁচাতে হবে, দূষণ কমাতে হবে, বর্জ্য সরাতে হবে, নৌপথে আবার নৌযান চলতে দিতে হবে। নির্দেশটি নিঃসন্দেহে মহৎ। আমাদের দেশে নির্দেশের অভাব কখনো ছিল না; অভাব ছিল নির্দেশটি কোথায় গিয়ে থামে, তা বোঝার।
নদী পরিষ্কারের নির্দেশ সাধারণত প্রথমে মন্ত্রণালয়ে যায়, সেখান থেকে দফতরে, দফতর থেকে কমিটিতে, কমিটি থেকে উপকমিটিতে। সবশেষে নদীর কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নদীটি নিজেই হয়তো অবসর নিয়ে ফেলে।
তবু আশার কথা আছে। প্রবাসীরা আগস্টে প্রায় ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, আর অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসেছে ৫.৮২ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী ভাইয়েরা দেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে টেনে তুলছেন যে, তাদের যদি একদিন বলা হয়- ‘আপনারা একটু কম পাঠান, বাজেটের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না’, তাহলে অর্থনীতিবিদরা সম্ভবত সম্মিলিতভাবে অজ্ঞান হয়ে যাবেন।
অন্যদিকে জ্বালানি ভর্তুকির হাঁড়িতে আগুন জ্বলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, গ্যাসের দাম বাড়ে, যুদ্ধ লাগে, সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, আর বাংলাদেশের বাজেট তখন এমন মুখ করে বসে থাকে, যেন বাড়ির কর্তা বাজার থেকে ফিরে দেখেছেন, আলু-পেঁয়াজের সঙ্গে দোকানদার ভুল করে একটি ফ্রিজও ধরিয়ে দিয়েছে। ভর্তুকি না দিলে জনগণ কষ্ট পায়, বেশি দিলে বাজেট কষ্ট পায়। অর্থাৎ কষ্টের মালিক বদলায়, কষ্টটি যায় না।
পোশাক শিল্পও এবার নিজের ঘর ঝাড়ু দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিএমইএ নিষ্ক্রিয় ও নিয়ম না মানা কারখানাগুলোর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ সংগঠনে সদস্য হওয়া সহজ, কিন্তু সদস্যের মতো আচরণ করা কঠিন। এই সত্যটি আমাদের বহু প্রতিষ্ঠান এখনো আবিষ্কার করেনি। কারখানা যদি শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে এমনভাবে দেখে, যেমন পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র দেখে-‘এটা কি সিলেবাসে ছিল?’- তাহলে রফতানির সুনাম বেশিদিন টেকে না।
গুম প্রতিরোধের আইন নিয়েও আলোচনা চলছে। আইনটি শক্তিশালী হওয়া দরকার, কিন্তু তার চেয়েও দরকার আইনটি যেন কাগজে বসে থেকে ধুলো না খায়। আমাদের দেশে আইন অনেক সময় এমন ভদ্রলোকের মতো, যিনি সভায় এসে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন, তারপর দরজার বাইরে বেরিয়ে দেখেন- কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না।
আইন যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তবে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদেরও বুঝতে হবে, নাগরিকের অধিকার কোনো সরকারি ফাইলের নিচে চাপা দেওয়ার বস্তু নয়।
এদিকে ভারতীয় বিতর্কিত সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ ঢাকায় এসে নানা কর্মকাণ্ড করে গেছে- এমন খবরে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে। সামাজিক মাধ্যমের অবস্থা এমন যে, কেউ চা খেলে একদল বলে, দেশ বিক্রি হয়ে গেল। আর কেউ চা না খেলে অন্যদল বলে বিদেশি ষড়যন্ত্র। সাংবাদিকের বক্তব্যের জবাব তথ্য দিয়ে দেওয়াই সভ্যতার লক্ষণ; চিৎকার করে জবাব দেওয়া সাধারণত প্রমাণ করে যে, তথ্যের ঝুড়িটি খালি।
বিশ্বের বড় ছবিটিও খুব শান্ত নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু মোকাবিলায় বিপুল অর্থ দরকার, কিন্তু ঋণের সুদ এমনভাবে বাড়ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের আগে ব্যাংকের চিঠিই এসে দরজায় কড়া নাড়ছে।
আইএমএফ বলছে, বেসরকারি ও স্বল্পসুদের জলবায়ু অর্থায়ন বাড়াতে হবে। কথাটি যুক্তিসঙ্গত। তবে উন্নত দেশগুলো যদি সম্মেলনে এসে বলে, ‘আপনারা গাছ লাগান, আমরা ছবি তুলব’- তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমবে না, শুধু ছবির সংখ্যা বাড়বে।
তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা জ্বালানি বাজারকে এমন অস্থির করে রেখেছে যে, দূরের যুদ্ধের খবর ঢাকার বাসভাড়ায় এসে বসে। পৃথিবী এখন এত ছোট হয়েছে যে, এক দেশের ক্ষেপণাস্ত্র আরেক দেশের রান্নাঘরের বাজেট নষ্ট করে।
অতএব বাংলাদেশের কাজও স্পষ্ট: নদী বাঁচাতে হবে, ভর্তুকির হিসাব ঠিক করতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে, রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং বাইরের ঝড়ের আগে ঘরের জানালা বন্ধ করতে হবে। নইলে একদিন দেখা যাবে- নদী নেই, বাজেট নেই, কিন্তু নির্দেশের ফাইল আছে; আর সেই ফাইলটি দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী জলপথ হয়ে গেছে।




