শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বিটিভির পর্দায় বিরোধী দল: গণতন্ত্রের চর্চায় সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত

অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

বিটিভির পর্দায় বিরোধী দল: গণতন্ত্রের চর্চায় সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত
অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বিটিভির পর্দায় বিরোধী দল! বাংলাদেশে এটি ভাবা যায়? গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি সুস্থ, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য হলেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর প্রতিফলন তেমন দেখা যায় না। এর একটি বড় দুর্বলতা হলো—ক্ষমতায় থাকা দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে প্রায়ই নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন গণমাধ্যমে সরকার ও সরকারি দলের উপস্থিতি দৃশ্যমান হলেও বিরোধী রাজনৈতিক মত, সমালোচনা ও বিকল্প চিন্তার জায়গা অনেক সময়ই সীমিত থেকেছে।

এই বাস্তবতায় গত ২৫ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর একটি ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরকার ও বিরোধী দলের সংবাদ আনুপাতিক হারে প্রচার করা হবে। শুধু সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দল নয়, সংসদের বাইরের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী বিটিভিতে নিজেদের ছবি ও ব্যক্তিগত প্রচার কমিয়ে আনার নির্দেশনাও দিয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

দেখতে এটি হয়তো একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা। কিন্তু এর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্য অনেক গভীর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কার?

প্রশ্নটি খুবই মৌলিক। বাংলাদেশ টেলিভিশন কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো জনগণের বিভিন্ন মত, চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থান ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিতর্ককে যথাযথভাবে তুলে ধরা।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি একমুখী বক্তব্যে নয়; বরং ভিন্নমত, বিতর্ক এবং বিকল্প মতামতের অবাধ প্রবাহে। সরকার তার নীতি ও কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরবে—এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে বিরোধী দল সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে এবং জনগণের সমস্যা ও উদ্বেগ তুলে ধরবে—এটিও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যদি কেবল সরকারের সাফল্য প্রচার করে, তাহলে তা সরকারি প্রচারমাধ্যমে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যদি সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের বক্তব্য ন্যায্যভাবে স্থান পায়, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থেই জনস্বার্থভিত্তিক ‘পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং’-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই জায়গাটিতেই তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সরকারের এই বার্তাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

রাজনীতিতে শুধু বড় নীতি ঘোষণা নয়, অনেক সময় একটি ছোট সিদ্ধান্তও সরকারের রাজনৈতিক দর্শন ও মানসিকতার পরিচয় বহন করে। বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচারের সিদ্ধান্ত সেই ধরনের একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তার অন্তর্নিহিত দর্শন হলো—সরকার সমালোচনাকে ভয় পাবে না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে শুধু সরকারের বক্তব্য প্রচার করলেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে না; বরং জনগণ যখন একই মাধ্যমে সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি বিরোধী দলের সমালোচনা ও বিকল্প মতামত শুনতে পায়, তখন তারা নিজেদের বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়।

এটি সরকারের জন্যও একটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ। কারণ যে সরকার নিজের কাজের ওপর আস্থাশীল, সে সরকার ভিন্নমতকে নিষিদ্ধ করতে চায় না। বরং মতের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই নিজের নীতি ও কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আরও পড়ুন

ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প শেষ পর্যন্ত যেন কাগজেই আটকে না যায়

এখানে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভূমিকা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুমাত্রিক এবং গণতান্ত্রিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা বর্তমান সরকারের ইতিবাচক রাজনৈতিক মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নিজেদের ছবি কম দেখানোর সিদ্ধান্তও তাৎপর্যপূর্ণ

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর বিটিভিতে নিজেদের ছবি কম দেখানোর নির্দেশনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার একটি পরিচিত বাস্তবতা। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছবি ও কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত উপস্থিতি কখনো কখনো সংবাদ এবং প্রচারের মধ্যকার সীমারেখাকে দুর্বল করে দেয়। এই বাস্তবতায় নিজেরাই নিজেদের ছবি কম দেখানোর কথা বলা একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা।

এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে—রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোনো ব্যক্তির প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার একটি প্রতিষ্ঠান।

যদি এই নীতি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিটিভির সংবাদে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিকতা বাড়বে। কে কী বলেছেন, তার চেয়ে কী নীতি নেওয়া হয়েছে, তার ফলাফল কী, জনগণ কী সুবিধা পাচ্ছে এবং কোথায় সমস্যা রয়েছে—এসব প্রশ্ন গুরুত্ব পাবে। সংবাদ তখন ব্যক্তি থেকে জনগণের দিকে, প্রচার থেকে তথ্যের দিকে এবং আনুগত্য থেকে পেশাদারিত্বের দিকে অগ্রসর হবে।

গণতন্ত্রে বিরোধী দল শত্রু নয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় সমস্যা হলো, বিরোধী দলকে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা। অথচ গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়; বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। একটি কার্যকর বিরোধী দল সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে, জনস্বার্থের প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং বিকল্প নীতির প্রস্তাব দেয়। সরকারের প্রতিটি সমালোচনা যে সঠিক হবে, তা নয়। কিন্তু সমালোচনা করার অধিকার এবং সেই সমালোচনা জনগণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।

BTV
বাংলাদেশ টেলিভিশন। ছবি: সংগৃহীত

বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচার করা হলে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে। জনগণ একই প্ল্যাটফর্মে সরকারের বক্তব্য শুনবে, আবার বিরোধী দলের বক্তব্যও শুনবে। এরপর তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, তথ্য ও বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।

গণতন্ত্রে জনগণকে একমুখী তথ্য দেওয়া নয়; বরং বহুমাত্রিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ঘোষণার পর বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—ঘোষণা যতই ভালো হোক, তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচারের সিদ্ধান্তকে একটি স্থায়ী ও কার্যকর নীতিতে রূপ দিতে হবে।

কোন ধরনের সংবাদ প্রচার হবে, কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য নির্বাচন করা হবে, ‘আনুপাতিক হার’ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত কতটা পেশাদার ও স্বাধীন হবে—এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই উদ্যোগ যেন ব্যক্তি বা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থাকে। এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বহুমতের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচালনা করতে বাধ্য হয়।

একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা

সরকারের এই মনোভাবের ঘোষণা এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিজেদের ছবি কম প্রচারের নির্দেশনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যায়। বার্তাটি হলো—সরকার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে কেবল ক্ষমতাসীনদের প্রচারের যন্ত্র হিসেবে দেখতে চায় না; বরং এটিকে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তি, মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক বিতর্কের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করতে চায়।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা। বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়তো একাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বদলে দেবে না। কিন্তু বড় পরিবর্তনের সূচনা প্রায়ই ছোট কিন্তু প্রতীকী সিদ্ধান্ত থেকে হয়।

আরও পড়ুন

দরজা-জানালা খোলা থাকুক, রাষ্ট্রের আলো যেন পড়ে মানুষের ঘরে

এই সিদ্ধান্ত যদি আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—এই সাহসী ঘোষণাকে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া। আর প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে, যদি তাঁর ঘোষিত নীতি বাস্তবে বিটিভির পর্দায় দৃশ্যমান হয়।

কারণ, প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সরকার শুধু নিজের কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করে না; বরং ভিন্নমতের জন্যও সমানভাবে মাইক্রোফোন উন্মুক্ত করে দেয়।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস এক্সপার্ট

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর