চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় পাসের হার প্রায় ৬.২ শতাংশ কমে ৬২.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রায় ৬.৯ লাখ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাননি। অনেকে একে আকস্মিক 'বিপর্যয়' হিসেবে চিহ্নিত করছেন, কিন্তু বাস্তবে এ ফল কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় — এটি ধাপে ধাপে দীর্ঘকালীন সমস্যার প্রকাশ।
পরীক্ষা গ্রহণ ও নকল প্রতিরোধে এ বছর যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে — সিসিটিভি নজরদারি, পরীক্ষকদের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নির্দেশনা— এগুলো অবশ্যই কার্যকরী। তবে দীর্ঘদিন আমরা এমন একটি পাসের হার দেখে আসছিলাম যা প্রকৃত শিক্ষার সাথে মিলতো না। অনিয়মের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো ফল কখনোই কারো জন্য কল্যাণকর নয়। কিন্তু শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি কঠোর করলেই গুণমান বাড়ে না — যদি শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত শিক্ষাদান না করা হয়।
করোনা মহামারির সময় প্রায় দুই বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তখন মূল্যায়ন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন, পাসের হার ছিল প্রায় শতভাগ। সেই সময়ের শিক্ষার ফাঁক কেবল এখনই প্রকাশ পাচ্ছে। এরপর গত বছরের জুলাই মাসে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলন হয়েছিল, তাতে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম আরও ব্যাহত হয়েছে। যে শিক্ষার্থী আড়াই বছর সঠিকভাবে ক্লাস করতে পারেনি, তাকে একদিন কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি করলে ফল কী হবে, তা অনুমেয়।
ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করছেন গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে। এটা কোনো নতুন সমস্যা নয়। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই দুটি বিষয়ে যোগ্য শিক্ষকের চরম অভাব রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে তিন-চারটি শ্রেণি পাঠদান করতে হয়, যেখানে মানসম্পন্ন পাঠদান সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের মুখস্তনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে — প্রয়োগ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের মুখোমুখি হলেই তারা ব্যর্থ হয়ে পড়েন।
পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ ও প্রশ্নপত্রে প্রয়োগ-ভিত্তিক প্রশ্ন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক — কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কি? অনেক ক্ষেত্রে উত্তরটি না। ফলে যারা শুধু গাইড ও সাজেশন নির্ভর করে পড়েছেন, তারা বিপদে পড়েছেন।
এ বছরের ফলে আরেকটি সত্য উন্মোচিত হয়েছে — শিক্ষার সুযোগে ব্যাপক বৈষম্য। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের ফল তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাসের হার অনেক নেমে এসেছে। আর্থিক সংকট, অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষক সংকট — সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থী শহরে জন্মগ্রহণ করলে যে সুবিধা পান, গ্রামে তা মেলে না। এই বৈষম্য দূর না করলে কখনোই সামগ্রিক ফল উন্নত হবে না।
এ বছরের ফলপতনকে কেবল 'ব্যর্থতা' বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয় — এটি কৃত্রিম সুখের পরিবর্তে প্রকৃত বাস্তবতার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শুধু ফল প্রকাশ করে দায় সারলে চলবে না। যারা পিছিয়ে পড়েছেন, তাদের পুনর্ব্যক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কোভিড ও সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট শিক্ষার ফাঁক পূরণে বিশেষ কার্যক্রম নিতে হবে।
পরীক্ষা কঠোর হবে — এটা ভালো লক্ষণ। কিন্তু তার আগে শিক্ষাদানও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই 'বিপর্যয়' আমাদের অপেক্ষা করবে।
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, আবারও পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। শিক্ষা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া, কোনো এক বা দুটি পরীক্ষার ফলাফল সমগ্র শিক্ষাজীবনকে স্থগিত বা বন্ধ করে দেয় না। ব্যর্থতা হলো সাময়িক বাধা, চিরদিনের শেষ নয়।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, প্রধান সম্পাদক Thesylhetpost.com , জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) যুক্তরাজ্যে কর্মরত, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা (আরএম) Unison।
এআরএম




