গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিককে শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে প্রার্থিতা থেকে বিরত রাখার কোনো বিধান নেই। বরং, শিক্ষাগত যোগ্যতাকে প্রার্থিতার বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূলনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
অতীতে আদালত এ ধরনের শর্তকে গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী বলে বাতিল করেছেন। তবে কেউ যদি মনে করেন যে শিক্ষাগত যোগ্যতা যোগ করা প্রয়োজন, তবে তা শুধুমাত্র সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই করা সম্ভব—কিন্তু এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে তা সংবিধানে স্বীকৃত সমতা ও সার্বিক অংশগ্রহণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
সংবিধান ও আইনের বর্তমান বিধান
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য মাত্র দুটি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে: প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স অন্তত ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত কোনো শর্ত সংবিধানে নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইনে কোনো ধরনের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত নেই।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৮৯ সালে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম নির্বাচন কমিশন মামলায় আদালত শিক্ষাগত যোগ্যতাকে প্রার্থিতার শর্ত হিসেবে আরোপকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেন।
উক্ত রায়ে বলা হয়েছে—এই ধরনের শর্ত কার্যকর করা হলে তা দেশের সার্বিক ভোটাধিকার ও প্রতিটি নাগরিকের সমান অংশগ্রহণের অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণভাবে খর্ব করবে। গণতন্ত্র কখনোই কেবল সাক্ষর বা শিক্ষিত শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
আলোচনা ও বিরোধিতা
দেশজুড়ে বর্তমান এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যারা প্রার্থিতায় শিক্ষাগত যোগ্যতা আরোপের পক্ষে মত দেন, তাদের যুক্তি হলো—এতে করে নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের ন্যূনতম জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবা ও প্রতিনিধিত্বমূলক কাজের সামগ্রিক মান বাড়বে।
অন্যদিকে, যারা এর বিরোধিতা করেন, তাদের যুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে—এই শর্ত প্রয়োগ করা হলে দেশের বৃহৎ সংখ্যক সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের আরও যুক্তি হলো—দীর্ঘদিনের জনসেবামূলক অভিজ্ঞতা ও জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগ অনেক ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়েও অনেক বড় বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কাকে যোগ্য এবং কাকে অযোগ্য, সেই বিচার করার অধিকার মূলত ভোটারদের। শিক্ষাগত শর্ত আরোপ করা মানে ভোটারদের সেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সংকুচিত করা।
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আইন প্রণয়ন করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনও এ সম্পর্কে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিককে শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে প্রার্থিতা থেকে বিরত রাখার কোনো বিধান নেই।
দৃষ্টিকটু হয়েছে বর্তমান জাতীয় সংসদে এমন কিছু সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে যারা বাংলায় সঠিকভাবে কথা বলতে বা পড়তে পারেন না এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের জ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ—এই বাস্তবতা প্রশ্ন তৈরি করেছে যে, প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ড থাকা উচিত কি না।
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এইচএসসি এবং মেম্বার পদে এসএসসি সনদের মূল কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং তা না দিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হবে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এমন একটি দাবি ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মূলধারার কোনো গণমাধ্যম কিংবা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইটে এমন কোনো তথ্যের ভিত্তি বা প্রজ্ঞাপন নেই।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, ওয়াকিং ফর ন্যাশনাল সার্ভিস যুক্তরাজ্য
স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা (আর এম) unison, প্রধান সম্পাদক, Thesylhetpost.com
এআরএম




