মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

জনমিতিক লভ্যাংশের চাবিকাঠি: দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও কার্যকর পরিকল্পনা

মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

জনমিতিক লভ্যাংশের চাবিকাঠি: দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও কার্যকর পরিকল্পনা
মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান, উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় সংকট শুধু স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি নয়, বরং জনবল পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। একদিকে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে থাকে, অন্যদিকে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের জন্য অপেক্ষা করেন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর তুলনামূলক আধিক্য থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় সংকট এখনো প্রকট। ফলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—বাংলাদেশে কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, নাকি অভাব কার্যকর পরিকল্পনার? বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় যেখানে স্বাস্থ্যকর্মী সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে তাঁদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু সংখ্যা নয়; বরং সঠিক বণ্টন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাবও এর জন্য দায়ী।

এই প্রেক্ষাপটে কর্মশক্তি পরিকল্পনা (Workforce Planning) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কতজন কর্মী, কী ধরনের দক্ষতা এবং কোন এলাকায় প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার জনবল নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শুধু স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং দক্ষতা, পদসংখ্যার ভারসাম্য এবং ভৌগোলিক বণ্টন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নার্স ও মিডওয়াইফ তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

mahmud

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক জনমিতিক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি। এই পরিস্থিতি দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যাকে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) বলা হয়। ইতিহাস বলছে, পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ—যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া—এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে। কিন্তু জনমিতিক লভ্যাংশ কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবে রূপ নেয় না। সঠিক নীতি, পরিকল্পনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমেই এটি অর্জন সম্ভব। আর সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি দক্ষ মানবসম্পদ।

স্বাস্থ্যখাতের দৃষ্টিকোণ থেকে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের প্রথম শর্ত হলো কৈশোর থেকেই প্রতিটি ছেলে-মেয়ের শারীরিক, মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বাল্যবিবাহ কিংবা কিশোরী মাতৃত্ব একজন তরুণের পূর্ণ সক্ষমতা বিকাশে বড় বাধা। একজন অপুষ্ট কিশোর বা অসুস্থ কিশোরী ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মশক্তিতে পরিণত হতে পারে না। তাই কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পুষ্টি উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সচেতনতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য। সুস্থ, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী তরুণ প্রজন্মই জনমিতিক লভ্যাংশকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

সম্প্রতি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট) পরিচালিত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ বাস্তবায়িত Potentials of Health Workforce for Harnessing Demographic Dividend in Bangladesh: Opportunities, Challenges and Policy Implications শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মী উৎপাদন, চাহিদা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি দেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে এক লাখ ২৩ হাজারের বেশি নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক, প্রায় ৮৬ হাজার নার্স এবং ৩০ হাজারের বেশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকলেও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় মাত্র ১২ দশমিক ৭৮। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ হার হওয়া উচিত ৪৪ দশমিক ৫। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। এই ঘাটতি শুধু পরিসংখ্যানগত নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মানের ওপর।

তবে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকনির্ভর নয়। এটি চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, শক্তিশালী নার্সিং ও মিডওয়াইফারি ব্যবস্থা মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। তাই কেবল চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; স্বাস্থ্যকর্মীদের সব শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণের কারণে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অনেক দেশ বিদেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক স্বাস্থ্য পেশাজীবী বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী হলেও ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষা, সনদের স্বীকৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

mahmud

তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের শিক্ষা শুধু ডিগ্রিকেন্দ্রিক না রেখে গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যকর্মী উন্নয়ন কেবল স্বাস্থ্যনীতির বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার—সব কিছুর সঙ্গেই সম্পর্কিত।

কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্তি শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কার্যকর জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, গবেষণা, নজরদারি, সরবরাহব্যবস্থা এবং দ্রুত সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের আত্মত্যাগ সেই বাস্তবতারই প্রমাণ। অনেকেই নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারই একটি অংশ।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ মহামারির ঝুঁকি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যখাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্যব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী না করা গেলে শহরমুখী চাপ আরও বাড়বে। স্বাস্থ্যখাতে যেকোনো সংস্কারই হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি এবং মানবসম্পদকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, সুষ্ঠু নিয়োগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই মানবসম্পদকে কাজে লাগানো গেলে শুধু স্বাস্থ্যসেবার মানই উন্নত হবে না; কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথও সুগম হবে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ তাই ব্যয় নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকের বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জনমিতিক সুযোগের এই সময়কাল চিরস্থায়ী নয়। যদি এখনই দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, কার্যকর পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবে না; বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদনির্ভর সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথেও বড় পদক্ষেপ নিতে পারবে।

লেখক: মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান, উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

এসএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর