শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

স্বাস্থ্য বাজেটের নতুন অধ্যায়

বরাদ্দ বৃদ্ধি থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন
প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বরাদ্দ বৃদ্ধি থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন

একটি দেশের উন্নয়নকে সাধারণত সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ কিংবা শিল্পায়নের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে। একজন অসুস্থ শ্রমিক, একজন অপুষ্ট শিশু কিংবা চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া একটি পরিবার জাতীয় উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ কোনো কল্যাণমূলক ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম লাভজনক বিনিয়োগ।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর হ্রাস এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি নীতিগত গুরুত্ব ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বাজেট কি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার জন্য যথেষ্ট, নাকি আমরা এখনও চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় আটকে আছি?


বিজ্ঞাপন


স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ: অর্থনীতির জন্যও লাভজনক
বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্যখাতে প্রতিটি কার্যকর বিনিয়োগ কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রতিফলন সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখনও মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।

চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ কেবল হাসপাতাল নির্মাণের বিষয় নয়; এটি সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

বাজেট বৃদ্ধি: ভালো সূচনা, কিন্তু দীর্ঘ পথ বাকি
স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর কর হ্রাস রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় এখনও জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের বেশী, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম।

স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান বিনিয়োগ পর্যাপ্ত নয়।


বিজ্ঞাপন


হাসপাতাল নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে হবে
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব। ফলে সাধারণ রোগীরাও সরাসরি জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যান। এতে উচ্চতর হাসপাতালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হয় এবং ব্যয়ও বেড়ে যায়।

সমাধান হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে জিপি বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ভিত্তিক সেবা, উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী সেকেন্ডারি কেয়ার এবং জেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করা। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই মডেলের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

একই সঙ্গে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে শুধু শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, অস্ত্রোপচার, মাতৃস্বাস্থ্য, রক্ত সঞ্চালন, টেলিমেডিসিন এবং এনসিডি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দিতে হবে।

ক্যানসার ও এনসিডি: ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সংকট
বাংলাদেশ দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে অসংক্রামক রোগই স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগ ইতোমধ্যে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষ নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হলেও অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন দেরিতে। তাই জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি, স্ক্রিনিং কর্মসূচি, জেলা পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণ কেন্দ্র, রেডিওথেরাপি সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরও জোর দিতে হবে। তামাক ব্যবহার এখনও ক্যানসার ও হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই আগামী বাজেটে সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করা, প্রতি শলাকায় নির্দিষ্ট কর বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত রাজস্ব স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। 

এতে একদিকে ধূমপান কমবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত হবে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্য: সুশাসনের নতুন হাতিয়ার
ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, ইউনিক হেলথ আইডি, ই-প্রেসক্রিপশন এবং ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; এগুলো স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রোগ পর্যবেক্ষণ এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প নেই।

সুশাসন ও মানবসম্পদ: সফলতার পূর্বশর্ত
বাজেট যতই বাড়ুক, যদি দুর্নীতি, অপচয় এবং অদক্ষতা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একইভাবে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী ছাড়া কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের কেন্দ্রে তাই থাকতে হবে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।

সবশেষ,বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাজেট বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু এটি গন্তব্য নয়। 

প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, ডিজিটাল রূপান্তর, স্বাস্থ্যবীমা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুশাসনে বিনিয়োগ করা যায় তার ওপর।

আগামী দিনের বাংলাদেশকে শুধু আরও বেশি হাসপাতাল নয়, আরও সুস্থ মানুষ দরকার। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধির প্রকৃত অর্থ হবে তখনই, যখন এটি একটি রোগকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে একটি প্রতিরোধভিত্তিক, মানুষকেন্দ্রিক এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করবে।

লেখক: সাবেক সদস্য, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন ও চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)

এসএইচ/

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর