বেকারত্ব বাংলাদেশে নতুন কোনো সমস্যা নয়। ধীরে ধীরে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করছে এবং যার ফলে তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই বিষন্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৬৩% বেকার (সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো [BBS], অক্টোবর-ডিসেম্বর,২০২৪/২০২৫)। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশ যার বর্তমান জনসংখ্যা ১৭.৭ কোটি (সূত্র: জাতিসংঘ জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ) যা বাংলাদেশের উন্ননয়নে প্রধান অন্তরায়। এদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা অতীব জরুরি।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি কাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা একটি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিতে পারে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ গ্রামে ফিরে গিয়ে আধুনিক উপায়ে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। এতে করে বেকারত্বের হার কমবে, পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা এবং বেকারত্ব
শিক্ষা অর্জন মানুষের জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ১.৪-১.৫ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ৮.১%। এছাড়াও প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় ২৬-২৭ লাখ এবং যার ৪০%-ই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত (সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো লেবার ফোর্স সার্ভে, ২০২২-২০২৩) যাদের শিক্ষিত বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বেশির ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর সরকারি চাকরি পাওয়ার উদ্দেশে পড়াশোনা করে। আবার কেউ কেউ করপোরেট চাকরিতে যোগদান করে। কিন্তু শিক্ষিত মানুষের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থান এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাবে একটা বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়ায়। এতে তারা যেমন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তেমনই দেশের একটা কর্মক্ষম অংশ বেকার থাকায় দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বেকার কিন্তু কর্মক্ষম মানুষ যদি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে তাহলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এছাড়া, বাংলাদেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে বর্তমানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে করে আমরা আমাদের মূল্যবান মানবসম্পদ হারিয়ে ফেলছি। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ও বেকারত্ব হ্রাসে ব্যর্থ হলে দেশের মূল্যবান মানবসম্পদ এভাবেই হারিয়ে যেতে থাকবে।
তরুণ প্রজন্ম ও কৃষি খাত
ভৌগোলিকভাবে বিবেচনা করলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭০% মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল (সূত্র: বণিক বার্তা, ড. মো হারুনুর রশীদ, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫)। ‘ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র মানব’ খ্যাত এ পি জে আব্দুল কালাম ভারতীয় উপমহাদেশের উন্নতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘কৃষি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, এটিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিক করতে হবে।’ বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান কৃষি খাতে এবং দারিদ্র্য কমাতে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ। স্টেট ইউনিভার্সিটি আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় বিশিষ্ট কৃষিবিদ বলেন,পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের কৃষিতে যে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছে, তার পেছনে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট শিক্ষিত তরুণের উদ্যোগ ও অবদান অনেক।’ (সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম, ১৪ জুলাই ২০২১)।
বাংলাদেশে মোট ৯ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদ রয়েছে। এসকল শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তাদের অর্জিত শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে। তারা নিজেরা কৃষি উদ্যোক্তা হতে পারে এবং পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ কৃষকদের চাষাবাদের আধুনিক উপায় ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শেখাতে পারে। কৃষি বলতে শুধু যে চাষাবাদ করাকে বোঝায় তা কিন্তু নয়। এখানে হতে পারে বিনিয়োগ, হতে পারে প্রযুক্তি ব্যবহার আবার হতে পারে ই-কমার্সের মাধ্যমে নতুন অনলাইন বাজার তৈরি করা। মাঠ থেকে উৎপাদিত টাটকা শাক-সবজি স্বল্প ও সুলভমূল্যে ভোক্তার নিকট পৌঁছানো।
উচ্চশিক্ষা অর্জন ও কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর একজন ব্যক্তি একটি স্থায়ী চাকরিতে যোগদান করবে। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরিকেই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। তাই চাকরি লাভের আশায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা এক প্রকার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এমতাবস্থায় কেউ যদি অন্য কিছু করার কথা ভাবে, যেমন উদ্যোক্তা হতে চায় বা ব্যবসায়ী হতে চায় তাহলে সমাজের মানুষজন ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে দেখে না। তারা ভাবে- ‘এত পড়াশোনা করে আবার ব্যবসা করবে! তাহলে এত পড়াশোনা করার দরকার ছিল?’ মানুষের এধরনের মন্তব্যের ভয়ে অনেকেই গতানুগতিক ধারা অর্থাৎ পড়াশোনা করার পর চাকরি করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে চায় না বা সাহস পায় না। এছাড়াও বাবা-মাও আশা রাখে যে তাদের সন্তান চাকরি করে অনেক বড় ও মানুষের মত মানুষ হবে। কোনো বাবা-মা-ই চান না তাদের সন্তান চাকরি করা বাদে অন্য কিছু নিয়ে ভাবুক। এরও যথাযথ কারণ আছে অবশ্যই। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারই মধ্যবিত্ত এবং এমন পরিবার থেকে যখন একটি সন্তান পড়াশোনা করে তখন বাবা-মা চান না জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে। ব্যবসায়ী হওয়া বা কৃষি উদ্যোক্তা হওয়া, কোনোটাই খুব সহজ কাজ নয়। এখানে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে তেমনই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
তরুণদের কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ ও এর চ্যালেঞ্জ
বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী প্রযুক্তির শিকলে বন্দী। তারা তাদের অধিকাংশ সময় কাটায় মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে। এক্ষেত্রে তাদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তোলা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। এছাড়াও যারা কৃষিতে আসতে ইচ্ছুক তাদের বেশির ভাগেরই কৃষি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম। কাজ দেখা আর কাজ নিজে করার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। কৃষিও ঠিক তেমনই একটি ক্ষেত্র। কোন সময় কোন ধরনের ফসল ভালো হবে বা কী ধরনের সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে এর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ দরকার। এছাড়াও বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবে অতি উৎসাহী হয়ে প্রথম পদক্ষেপেই অধিক বিনিয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই প্রথমত তরুণ সমাজকে কৃষিতে আসার জন্য উৎসাহী ও আগ্রহী করে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। সব সময় দ্রুত লাভের আশা না করে ধীর কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রাখতে হবে।

উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং কৃষি খাতে যোগ দান, সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
আমাদের সমাজে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পড়াশোনা করলেই ‘ভালো চাকরি’ করতে হবে যা মূলত ‘সাদা কলার চাকরি’ নামে পরিচিত। অপরদিকে কৃষিকে অনেকেই ‘কম মর্যাদার পেশা’ হিসেবে বিবেচনা করে। রবার্ট কে. মার্টন তার ‘স্ট্রেইন তত্ত্বে’ (Robert K. Merton,1938) বলেছেন, সমাজ উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কিছু গতানুগতিক লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। যেমন ঊচ্চশিক্ষা অর্জন করে একটি সম্মাজনক পেশায় যোগদান করা এবং আর্থিক সফলতা লাভ করা। কিন্তু বাস্তব সমাজ ভিন্ন। এখানে শিক্ষিত তরুণদের তুলনায় বাজারে চাকরি সীমিত। যার ফলে সমাজের তৈরি করা লক্ষ্য এবং সুযোগের মধ্যে একটি চাপ সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি একটি বিকল্প বৈধ উপায় হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী এমিলে ডুরখেইম ও ট্যালকট পারসনস ‘কার্যকরী দৃষ্টিকোণ’ থেকে ব্যাখ্যা করেন যে, সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই একটি কাজ আছে। অর্থাৎ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ মানবসমাজ তৈরি করছে। যাদের আমরা শুধু চাকরিকেন্দ্রিক করে তুলছি। আর যখন শিক্ষাব্যবস্থা চাকরির বাজারের সাথে মিলতে পারে না তখন শিক্ষিত বেকার তৈরি হয়। কিন্তু চাকরি ছাড়াও ব্যবসা, কৃষি বা অন্যান্য কাজও যে করা সম্ভব তা আমরা বুঝতেই চাই না। কৃষিখাতে শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের যুক্ত করতে সক্ষম হলে বেকারত্বের হার কমিয়ে আ। সেই সাথে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।
কার্ল মার্ক্সের দ্বন্দ্ব তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সীমিত সরকারি চাকরির বাজার এবং উচ্চ প্রতিযোগিতা শ্রেণিগত বৈষম্যকে আরও তীব্র করে, যার ফলে তরুণরা বিকল্প কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন হয়। কেউ অল্প পরিশ্রম করে অধিক টাকা উপার্জন করে আবার কেউ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও যথাযথ ফল লাভ করতে পারে না। বাংলাদেশে সরকারি চাকরির সুযোগও সীমিত এবং শহরকেন্দ্রিক চাকরির প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। ফলে তরুণরা ভিন্ন ভিন্ন চাকরি না খুঁজে একই ধরনের চাকরির পেছনে ছুটতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে কৃষিখাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে শহরমুখী চাপ হ্রাস পেতে পারে। সেই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং শ্রেণিগত বৈষম্যও কমে যাবে।
শিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকট নয় বরং এটি একটি সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জও। তবে এই সমস্যাকে অক্ষমতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। যথাযথ দিকনির্দেশনা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এটিকে নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব। এদেশের বিপুল পরিমাণ তরুণ জনগোষ্ঠী যদি শুধু সীমিত চাকরির বাজারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার মনোভাব গড়ে তোলে তাহলে বেকারত্ব হ্রাসের সাথে সাথে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিও আরও মজবুত হবে। বর্তমানে কৃষি খাত চাষাবাদের পাশাপাশি প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, গবেষণা, ই- কমার্স ও উদ্যোক্তা তৈরির এক বিশাল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষিত তরুণদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই করে তুলতে পারে। মেধাবী শিক্ষিত তরুণ সমাজকে যথাযথ দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। সঠিক দিকনির্দেশনা, সুযোগ ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তারাই হতে পারে এদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)




