ইদানীং প্রায়ই নিউজের শিরোনামে দেখি, সম্পদের ভাগ না পাওয়ায় বাবা কিংবা মায়ের লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার খবর। অবিচারের অভিযোগ তুলে, বাবার কবর ভাঙচুরও করেছে বাংলার দামাল যুবক। আর বাহারি দাবিতে ডাক্তার-নার্স অধিকাংশ সময় ইন্টার্ন ডাক্তার-নার্সদের কর্মবিরতির খবর প্রায়ই শোনা যায়। এটার আসল রহস্যটা কী?
আচ্ছা বাবার লাশ আটকে রেখে সম্পদের দাবি করা কুলাঙ্গার ছেলে আর রোগীদের জিম্মি করে কর্মবিরতির আন্দোলনে নামা শিক্ষিত ডাক্তার কিংবা নার্সদের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? ওই কুলাঙ্গার তো মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে টানাটানি করে, কিন্তু আপনি তো শিক্ষিত জীবন্ত মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ে নামলেন। এর ফলে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর দায় কে নেবে?
বিজ্ঞাপন
আপনাদের দাবিগুলোও মানবিক। কিন্তু সে মানবিক দাবি আদায়ে রোগীদের জিম্মি কেন? তাদের কি ক্ষমতা আছে? ক্ষমতা থেকে থাকলে আপনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আছে? জনপ্রতিনিধিদের আছে। যাদের স্যার ডাকতে ডাকতে মুখের ফ্যানা তুলে দেওয়ার কালচারও আমরা দেখেছি।
সাধারণ রোগীদের জিম্মি কেন? সেই স্যারদের জিম্মি করতে পারেন না? যাদের একটি নির্দেশনায় পুরো সিস্টেম বদলে যাবে। কখনো তো দেখলাম না, এদেশের কোনো এমপি-মন্ত্রী কিংবা প্রশাসনের বড় কোন কর্তা অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছে। কেন তোলে না? সাধারণ মানুষ কি তা বোঝে না? ১২০০ বেডের হাসপাতালে ২৪০০ রোগীর সেবার চাপের অজুহাত তুলে তো ডাক্তারা একজন সাধারণ রোগীর সঙ্গে ভালো করে কথা বলার সময়ও পান না। অনেক দাম, আপনাদের সময়ের। প্রতি মিনিটে ৫০০, ১ হাজার, ১০ হাজার টাকার নোটের হাতছানি। অথচ যখন ভিআইপি রোগী আসে, নিষেধ করার পরেও ডাক্তার-নার্সরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সে দৃশ্য তো আমরা দেখেছি। সাধারণ বেডে রোগীরা ডাক্তারের দেখা পান না, অথচ সিনিয়র ডাক্তার ওই একই হাসপাতালের ভিআইপি রোগীর কেবিনে গিয়ে আলগা খাতির করার কালচাল দূর করার কি পদক্ষেপ নিয়েছেন আপনারা?
দুর্বলের ওপরই সব জুলুম!
আর দাবি যেন কী তুলেছেন? সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে রোগীর সঙ্গে আগত অতিরিক্ত স্বজন বা অ্যাটেনডেন্ট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। খুব ভালো কথা। কিন্তু কত বড় ‘সু’ থাকলে সুচিকিৎসা হয়, জানেন তো মশায়। রোগীর সঙ্গে তার স্বজনরা থাকবেই। এটা স্বাভাবিক বিষয়। আপনার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন রোগীর স্বজন থাকার মতো সুব্যবস্থা তো দূরে থাক, রোগীর স্বাভাবিকভাবে থাকার ব্যবস্থাই তো করতে পারেনি। এর মধ্যে আছে এই আনো, সেই আনো। জরুরি একজন রোগীর সঙ্গে দুজন স্বজনতো লাগে শুধু ওষুধ আনতেই। ডাক্তার ডাকতে, নথি লিখতে, রোগী সামলাতে আরও অন্তত দুজন। আর স্বজন না থাকলে আপনাদের আচরণ কেমন হয়? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো? সেটি না পারলেও দোষ নেই। অন্তত ঘুমানোর আগে ওই সাধারণ রোগী যে কি না, আপনার হাসপাতালের বেডের নিচে অসুস্থতার যন্ত্রণায় কাতরায়, তার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে দেখিয়েন। কেননা যারা মানবিক ডাক্তার তারা এই কল্পনা করার শক্তিটা রাখেন। একারণে হাজার টাকার নোটের জায়গায় খোঁজেন, অসহায় রোগীর ভালোবাসা আর দোয়া।
বিজ্ঞাপন
আর আপনারা যদি সেই স্বজনের দায়িত্ব পালন করার ব্যবস্থাও করতে পারতেন, তাহলে তো কোনো আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালেই যেতে হতো না। বাইরে থেকেই আপনাদের জিম্মায় রোগীকে দিয়ে আসতো। কিন্তু সেটা পারেননি কেন? কার ব্যর্থতা। কার স্বার্থে সেটা সম্ভব হয় না। আপনারা তো শিক্ষিত মানুষ। খোঁজেন না কেন সে প্রশ্নের উত্তর। আর খুঁজে পেলেই বা কি পদক্ষেপ নিয়েছেন? না কি পদক্ষেপ হিসেবে রোগীকেই জিম্মি করার থিওরি আবিষ্কার করলেন?
দ্বিতীয় দাবি কী যেন? প্রতিটি ওয়ার্ডে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা আনসার সদস্য মোতায়েন। এটা খুব দারুণ একটা থিওরি। স্বাস্থ্যসেবার বড় অর্জন ও আবিষ্কারও বটে। ২৪ ঘণ্টা একটা ‘দারোয়ান’ থাকবে পাহারায়। লজ্জা, লজ্জা। এর চেয়ে স্বাস্থ্য সেবার বড় লজ্জার কিছু আছে বলে মনে হয় না। যে রোগী তার ডাক্তারকে ‘ভগবান’ কিংবা স্রষ্টার পরে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখে। সেই ভগবানকে হামলা করা হবে? সেটি করবে আবার রোগীর স্বজন! সেজন্য আগে থেকে অস্ত্রসজ্জিত বডিগার্ড লাগবে!
আরও পড়ুন
রামেক পরিচালকের ‘ফাঁসির রায়’ ও কিছু কথা
তৃতীয় দাবিটি যেন কী? দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। এই দাবিটি অবশ্য ভালোই। রোগী ও তার স্বজনদের পেটানোর দায়িত্বে ব্যর্থ হলে অবশ্যই আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। ব্রাহ্মণদের অধিকার সুরক্ষা সবার আগে।
চতুর্থ দাবিটাও দারুণ। পূর্বে সংঘটিত সকল হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা। দেশে আইনের শাসনের কাঙ্ক্ষিত চর্চা থাকলে অন্তত একটি ঘটনাতেও এমন ঘটনার বিচার জাতি দেখতে পেতো। কোনো হামলায় কাম্য নয়। অবশ্যই সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরাও এটির বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
এবার পঞ্চম দাবিটায় আসা যাক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিয়ে ছড়ানো অপপ্রচারমূলক ভিডিও অপসারণসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কোনটি অপ্রচার আর কোনটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা সেটি আগে বুঝতে হবে। চিকিৎসা না পেলে সেটির অভিযোগ তোলার সাংবিধানিক অধিকার প্রত্যেক মানুষের রয়েছে। হাসপাতালকে সেনানিবাস বানানোর বহু পায়তারা আমরা পূর্বে দেখেছি ও দেখছি। অধিকাংশ ডাক্তার-নার্সরা আবার এটার সঙ্গে একমতও। এ জাতির দুর্ভাগ্য, যে ডাক্তার বা যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চোখ বুজে বিশ্বাস করে না, সেখানেই তাকে বাধ্য হয়ে যেতেই হয়!
ছোট মুখে অনেক কথাই বললাম। কেননা স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি সেবার যখন এমন বেহাল অবস্থা, তখন ডাক্তার-নার্সসহ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত সকলের দায়িত্বশীল আচরণ, আন্দোলন জাতি কামনা করেন। জীবন শুধু রোগীর নয়, ডাক্তারেরও আছে; এখাতের সঙ্গে যুক্ত ও নীতিনির্ধারকদেরও আছে। শুধু চোখের কালা চশমা আর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। এটা একান্তই আমার নিজের পর্যবেক্ষণ। আমার চিন্তার সঙ্গে আপনার মিল নাও ঘটতে পারে। তবে সকল আলোচনায় সমাধানের উদ্দেশ্যে করা। কোনো পেশাকে ছোট করা নয়।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী




