বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

স্বাধীনতার ৫৫ বছর: আত্মসমীক্ষা উপেক্ষিত

মনজুরুল আলম মুকুল
প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

mukul
মনজুরুল আলম মুকুল। ছবি: সংগৃহীত

হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল এদেশের মানুষ। এই দিন আমাদের কাছে যেমন গৌরবদীপ্ত, চিরস্মরণীয় ও অনন্য সাধারণ দিন তেমনি এক তীব্র বেদনারও বটে। কেননা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছিল এই স্বাধীনতা। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের আশায় এ দেশের লাখ লাখ মানুষ সেদিন তাদের বর্তমানকে বিসর্জন দিয়েছিল। কিন্তু আমরা সেই রক্তঋণ যেন পরিশোধ করতে পারছি না। বার বার ভঙ্গ হয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। স্বাধীনতার সুফল পাওয়ার জন্য ২০২৪ সালেও আবার রক্ত ঝরল। যে কারণে স্বাধীনতার ৫৫তম দিবসে আত্মসমীক্ষার অনেক বেশি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

৫৫ বছরে আমাদের যেমন সফলতা আছে তেমনি ব্যর্থতার পাল্লাও অনেক বেশি ভারি।  বলা যেতে পারে সমাজ ও মানব উন্নয়নের সূচকে বেশ কিছুটা এগিয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১,৮২৪ ডলার, ভারতের প্রায় ২,৮১৮ মার্কিন ডলার  ও নেপালের ১,৫৩৫ মার্কিন ডলার সেখানে বংলাদেশের বাংলাদেশের ২,৮২০ মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকায় দেখা গেছে, ভারতসহ অনেক দেশের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ।


বিজ্ঞাপন


আমাদের ভিতরে বিপ্লবসহ নানা বিষয় নিয়ে এক ধরনের হীনমনতা কাজ করে। যেমন ছাত্র-জনতার ২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে সমর্থন করলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা হয় কিনা এমনটা অনেকে ভেবে থাকে। আবার অনেকে মনে করে শুধু ১৯৭১ সালকে ধরতে হবে। তারা ১৯৪৭ সাল ও ব্রিটিশ বিরোধী অন্যান্য আন্দোলনকে সামনে নিয়ে আসতে চায় না।

১৭৫৭ সালের পথ ধরে ১৯৪৭ এরপর ১৯৭১ এরপর ২০২৪। কোন গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব, গণআন্দোলন বা জনতার রায়কে ছোট বা অবেহেলার সুযোগ নেই। কোন কিছুই নিরর্থক, অর্থহীন, কারণহীন ছিলনা। প্রতিটি বিপ্লব ও আন্দোলনকে ধারণ করতে হবে এবং প্রতিটি থেকে শিক্ষা নেওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

১৯৭১ সাল সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও চিরস্মরণীয় ঘটনা। এ দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইসিহাসে ৭১ সালের চেয়ে বড় কোন ঘটনা নেই। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ৭১ সালে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা। ৭১ এসেছিল আবার কয়েকটি ঢেউ এর মাধ্যমে- যেমন- ভাষা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ৬-দফা, গণঅভ্যুত্থান।

প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে রয়েছেও এদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ৪৭ সালেও এদেশের মানুষ অনেক আশায় বুক বেঁধে ছিল ও পাকিস্থান আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছিল। এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে ছিল জমিদারি প্রথা উঠে যাবে, জমির উপর সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, অতিরিক্ত খাজনার হাত থেকে রেয়াই পাবে, এ দেশের মানুষ লেখাপড়া শিখতে পারবে, চাকরি পাবে, ইত্যাদি।  


বিজ্ঞাপন


আমাদের অন্যতম ব্যর্থতা স্বাধীনতার এত বছর পর স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারা।  এক সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর এদেশের মানুষের কোন আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না।  নিয়োগ প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন সবখানে একই অবস্থা ছিল। 

এদেশের সাধারণ মানুষের চাকরিসহ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা খুব কমই কপালে জুটেছে। আশা করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর কোনো বৈষম্য থাকবে না, সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। কিন্তু কিছু লোক তাদের সুবিধাবাদী চরিত্র বদলানোর পরিবর্তে আরও চরম আকারে চর্চা শুরু করে। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা শেষ করে চাকরির জন্য ‘লাইনঘাট, ‘সিস্টেম’ আর ‘মামু খালুর’ সন্ধানে ব্যস্ত থাকতে হয়। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এর কোটা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৪০০ লোক নিহত হয়েছে। আহত ও পঙ্গু হয়েছে হাজার হাজার।  নিহতদের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোক গাঁথা। সাভারের আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ হয়েছে যেগুলো দেখে মানুষ বাকরুদ্ধ, অসুস্থ হয়েছে।

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে  দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। গণনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার নীতি অনুসরণ করা না হলে পূর্বের বৈষম্যমূলক অবস্থা আবার ফিরে আসার আশাঙ্খা রয়েছে।  স্বচ্ছ ও মেধার ভিত্তিতে সবখানে যোগ্যরা নিয়োগ পাবে সেটাই নতুন সরকারের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা।

আমাদের দেশের মানুষ ভোটকে ‘উৎসব’ বলে মনে করে। ভোটের সময় দেশের গ্রাম-গঞ্জে গেলে বোঝা যায় এ দেশের মানুষ এই উৎসবে কতটা আগ্রহ নিয়ে সামিল হন। ভোট আসলে মেতে ওঠে তারা। সারাদিন ভোটের আলাপ-আলোচনা। চায়ের দোকান, হাটবাজার, মাঠ-ঘাট, অলিগলি, পাড়া মহল্লা সরগরম! আশা করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এদেশে গণতান্ত্রিক চর্চার আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র সেই পূর্বের শনির দশা থেকে বের হতে পারিনি। এটাই এ দেশের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, ক্ষমতাসীন বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়না। ক্ষমতাসীনরা  ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার এক ধরনের অপচেষ্টায়  লিপ্ত থাকে। ভোটার থাকতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া, পাতানো নির্বাচন, রাতের ভোট, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, ভোট ম্যাকানিজম, বন্দুকের নল, বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে সিল মারা, ভূতুড়ে ভোট, গায়েবি ভোট, টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, বিরোধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াসহ নানা ঘটনা বারবারই এ দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ত্রুটি দেখিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের ওপর ভর করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটা বাতিল করা হয়। ফলে যে তরি চড়ে আ. লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল, সেটা আর থাকল না। বিরোধী দলগুলো অনেক প্রতিবাদ আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে বহুবার বাধার সৃষ্টি হয়েছে এবং বহুবার নির্বাচন কমিশনের উপর এদেশের মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনাররা সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন। কিন্তু দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া কমিশনাররা নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ও শপথ ভঙ্গ করে বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করেছেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তা ও নির্বাচনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন অবান্তর।

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একমাত্র নির্বাচন নয়। আগামীর জাতীয় নির্বাচনগুলো কীভাবে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমুলক করা যায় সে ব্যাপারে বর্তমান সরকার কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটা এখন দেখার বিষয়। দেশে নির্দিষ্ট সময় পরপর সুষ্ঠু নির্বাচন আর ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা ভালো পরিবেশ খুবই আবশ্যক। বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব-সহিংসতা-অসন্তোষ-অরাজকতা-অস্থিতিশীলতা কাম্য নয়। এগুলো বারবার ঘটতে বা চলতে থাকলে বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে একটি সংঘাতময় ও অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকেই চলে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের আয়োজন করা নয়, গণতন্ত্রের অন্য সব বৈশিষ্ট্যগুলো যদি না থাকে তাহলে গণতন্ত্র হয় না। ভিন্ন ভিন্ন মত, বহুকণ্ঠ, বিতর্ক গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা বিরুদ্ধ মতের স্বীকৃতি দিতে চায় না এবং তর্ক-বিতর্ক কোন মতেই মেনে নিতে চায় না। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি একে অপরকে উচ্ছেদ করার অপচেষ্টার মতো এমন কিছু ঢুকে পড়েছে যা শুধু গণতান্ত্রিক পরিসরকে খর্বই করে চলেছে, এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।

বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে অনেকে অনেক তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা দিয়েছেন মন্তব্য করেছেন। তবে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, তত্ত্ব, কাঠামোবদ্ধ বা দার্শনিক ধারণা যা-ই বলুন, সেটা প্রথমে এসেছিল ১৫৭৯ সালে মোঘল সম্রাট আকবরের প্রধান উপদেষ্টা আবুল ফজল আল্লামির কাছে থেকে। প্রায় ৫০০ বছর আগে আবুল ফজলের অবাক করা কথাগুলো ঘিরেই যেন আজও বাংলার রাজনীতি পরিচালিত হয়।

জানা যায়, মোঘল সাম্রাজ্যের ১২টি প্রদেশের অন্যতম বাংলায় না এসে বাংলার অনেক তথ্য-প্রমাণ ও ইতিহাস সংগ্রহ করেন এবং তা থেকে এ সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যায় তিনি উপনীত হন। আবুল ফজল আল্লামা লিখেছিলেন, ‘বাংলা নামের দেশটি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে আবহাওয়ার কারণে অসন্তোষের ধুলা সবসময় উড়তেই থাকে। মানুষের শয়তানিতে এখানকার পরিবার ও জনপদগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।’

আবুল ফজলের মতে, স্নায়ু বিকলকারী আবহাওয়া মানুষকে কলুষিত করে ও কলুষিত মানুষ সার্বভৌম শাসনকে ধ্বংস করে। যে কারণে বহিরাগতদের ব-দ্বীপকে শক্তিশালী হওয়ার পথ সুগম করে। বাংলায় এমন পরিবেশ বিদ্যমান থাকে যেখানে কেউ গেলে বা যারা বসবাস করে, স্বাভাবিকভাবে সবাই সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের (বাঙালি) মধ্যে সহজে বিভেদ সৃষ্টি হয়। নিজেদের স্বার্থের বিষয়টি সবার কাছে প্রধান থাকে। ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সার্বভৌম শাসন ও সবার জন্য মঙ্গলকর (জাতীয় স্বার্থ) বিষয়সমূহ ধ্বংস করা তাদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়। এ কারণে তিনি লিখেছিলেন ‘এদের স্বার্থ দেখিয়ে বিভেদ সৃষ্টি কর আর সুবিধা নাও।’

আবুল ফজল সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিনব তত্ত্বটি শুধু দিয়েই যাননি, মোঘলরা অক্ষরে অক্ষরে তার বাস্তবায়ন করে এবং সফলতা পায়। বাংলার মানুষের অধঃপতনের এই অভিনব তত্ত্বটি ব্রিটিশ, ডাচ, পর্তুগিজ, ফরাসি সবাই জানত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক কর্মকর্তারা এই তত্ত্বটি জোরালোভাবে গ্রহণ করেছিল। রবার্ট ক্লাইভ জেনেশুনে বা তত্ত্বটি ভালোভাবে রপ্ত করে চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছিল। পরিবেশ সবই বিদ্যমান ছিল, তিনি শুধু খেলাটা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ক্লাইভ এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, চক্রান্তের ফল নিশ্চিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, পলাশী যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের মাত্র ৩২০০ সৈন্যের কাছে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৫০ হাজারের চৌকস বাহিনীর অভাবনীয় পরাজয় ঘটে। আর ইংরেজরা প্রায় দুশো বছর এর সফল বাস্তবায়ন করে গেছে।

বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশিদের কলকাঠি নড়ানো ও মাথা ঘামানো যেন স্বাভাবিক বিষয়। একে অপরকে শায়েস্তা করার জন্য, ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা থেকে কাউকে সরানোর জন্য বিদেশিদের সাথে হাত মেলানো যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া হয় জাতীয় স্বার্থ। বিদেশ থেকে একটা ফর্মুলা বা সিস্টেম আসে আর তারপর সেই মোড়কে আটকানো হয় এদেশের জনগণকে। 

আরও পড়ুন

ফরাসি বিপ্লব, জুলাই বিপ্লব ও আমাদের ভাবনা

যে কারণে গণতন্ত্রকে বাঁচানো প্রয়োজন

আমাদের পরাধীনতা বা অন্যের দ্বারা শোষিত হওয়ার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ছিল। এ ইতিহাস এদেশের মানুষ যেন ভুলে যেতে বসেছে। বিষয়টি আমরা প্রায় অনেকেই জানি, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূকৌশলগত স্থানে অবস্থিত। অনেকের কাছে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকারের জন্য বাংলাদেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও আঞ্চলিক রাষ্ট্র গুলোর আলাদা আলাদা স্বার্থ রয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশের যেকোনো ব্যাপারে তারা আগ্রহী ও কোনো না কোনো ভূমিকা রাখে।

 প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে পড়লেও নতুন করে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে সম্প্রসারণ ও আধিপত্যবাদের নীতি। বিশ্ব জুড়ে বেড়েছে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা।  বর্তমান বিশ্বে যার সামরিক শক্তি বা অস্ত্রভাণ্ডার আছে বা অর্থ আছে সেই শান্তি ও মানবাধিকারের কথা বলতে পারে। অনেকে কৌশলের মাধ্যমে সম্প্রসারণ ও আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কৌশলের একটি নীতি হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে গোলমাল বাধিয়ে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে সুযোগ বুঝে রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ এই ধরনের কোন চক্রান্তের মধ্যে আছে কিনা সেটা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন আছে।  বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করে অনেককে তেড়ে আসতে দেখা যায়। নিজ ভূমিতে থেকেও আমাদের প্রায় দেখতে হয় অন্যের চোখ রাঙানি আর শুনতে হয় নানা ধরনের সবক।  মিয়ানমার সে দেশের প্রায় ১২ লাখ  নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে এক  মহা মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। তারপরও মিয়ানমারকে জোর করে কিছু বলাতো দূরের কথা, তাদের সত্যিকার অর্থে আলোচনার টেবিলে বসানো যায়নি। 

যুদ্ধ আমাদের কারো কাছে প্রত্যাশিত নয়, আমরা শান্তি চায়। তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি না রাখা  বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় ধরনের বোকামি।  কনভেনশনাল ওয়ার বা প্রচলিত যুদ্ধের সরঞ্জাম অর্থাৎ বড় ধরনের সেনা বাহিনী,  ট্যাঙ্ক, কামান, বন্দুক, বিমান বর্তমান যুগে এগুলো আর বিবেচনার বিষয় নয়। এখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।  হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র,  অত্যাধুনিক ড্রোন ও রাডার প্রযুক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। বিষয়টি এমন নয় রাষ্ট্রের বাজেট থেকে কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচ করে অস্ত্র কিনতে হবে। মূল কথা গবেষণার একটা ধারা অব্যাহত রাখা ও নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের থেকে কম আয়ের দেশও সামরিক  প্রযুক্তিতে অনেক উন্নতি করেছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে যেন একটা অদৃশ্য শক্তির চাপ ও বাধা থাকে। এ সব বিষয় নিয়ে যেন আমাদের কারোর মাথা ব্যথা নেই।

সব থেকে বড় কথা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের পাশাপাশি বিশেষ কিছু রণনীতি-রণকৌশল প্রয়োজন। পাশাপাশি দল-মত- ধর্ম  নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা। তবে এ সব বিষয়ে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। 

বিগত দিনে লক্ষণীয়, কিছু মানুষের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা কাজ করছে, কীভাবে দ্রুত সময়ে অঢেল ধনসম্পদ ও টাকা-পয়সার মালিক হওয়া যায় এবং বিদেশে অর্থ পাচার। অনেকে টাকা পাচারের জন্য নিজেরাই চালু করে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ যেন সম্পদ হারানোর একটা চক্র বা সিস্টেমে পড়ে গেছে। বিষয়টি এমন, ইংরেজরা এক সময় জাহাজ ভর্তি করে এদেশ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে গেছে। আর এখন আমরা নিজেরাই বহন করে বিভিন্ন দেশে দিয়ে আসছি, যাকে বলা হয় ‘Self colonization’ অর্থাৎ নিজেরাই দাসে পরিণত হওয়া।

আমাদের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো বদলানোর পথ যে একেবারে বন্ধ, এমনটাও নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার, ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে সার্বভৌম শাসন, সবার জন্য মঙ্গলকর ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। এ দেশের মানুষ আসলে কী জন্য বা উদ্দেশে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল সেই মর্মার্থ উপলব্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর