২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে ছিলেন ড্যারন আসেমোগলু, সাইমন জনসন এবং জেমস এ. রবিনসন। তাদের গবেষণা ছিল ‘পলিটিক্যাল ইকনমি’, বাংলায় বলা যেতে পারে রাজনৈতিক অর্থনীতি। আমরা সাধারণভাবে জানি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি দুটো আলাদা বিষয় কেননা অন্তত পাঁচ দশক ধরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বা কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটাই পড়ানো হয়েছে। তবে বিষয় দুটির মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা আছে।
ওই তিন অর্থনীতিবিদ গবেষণা করে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর অর্থশাস্ত্রের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। আধুনিক অর্থনীতির যুক্তি, তর্ক, মডেল, বিশ্লেষণ-পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নানা সমস্যার সমাধান বের করেছেন। তাদের গবেষণায় তিনটি বিষয়ের উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো হচ্ছে ‘ঔপনিবেশিক ইতিহাস’, ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’ আর ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’। তাদের মতে, কোন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পিছনে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস। আবার অনেক দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পিছনে আছে ‘ঔপনিবেশিক ইতিহাস’। যেমন বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে রয়েছে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠান ও তাদের কার্যকলাপ। ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ আর তাদের প্রতিষ্ঠানের ছাপ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা,আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক দেশের অর্থব্যবস্থায় পরিলক্ষিত।
বিজ্ঞাপন
ওই তিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের মতে, একটা দেশ চলে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে। যেমন আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ, ইত্যাদি। গণতন্ত্র নিজেও একটি প্রতিষ্ঠান। অনেক দেশ স্বচ্ছ বা ভাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয় ‘ইনএফিশিয়েন্ট’ বা অদক্ষ। যে কারণে সেই সব দেশ পিছিয়ে পড়ে। তাদের মতে, গণতন্ত্রে সরকার চালানোর দায়িত্ব নেয় সমাজের এলিট গোষ্ঠী, আর দেশের বাকি সাধারণ মানুষ সেই গণতন্ত্রে যোগ দেয়। এটাকে বলা যেতে পারে দুই দলের একটা গেম। এই খেলার বিশ্লেষণ করতে দরকার গেম থিয়োরি বা দ্বন্দ্বতত্ত্ব। তাদের মতে, এই গেমটা এক বার খেলা হয় না, বছরের পর বছর ধরে চলে। এই গেমের ইক্যুইলিব্রিয়াম বা সন্ধি হিসাবেই গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। গত শতাব্দীর শেষার্ধের ১৭৫টি দেশের অর্থনৈতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে ঐ তিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ উপসংহার টেনেছেন-গণতন্ত্র ও আর্থিক বৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক মজবুত। কোনও দেশে গণতন্ত্র থাকলে, সে দেশে দেরিতে হলেও সমৃদ্ধি আসে।
আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে কি না বা সুগঠিত গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের। কতিপয় ক্ষমতাশালীর হাতে গণতন্ত্র বন্দি হলে তার চেহারা কেমন দাঁড়ায়, এদেশের দিকে তাকালেই তা বোঝা সম্ভব। কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি শাসকের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যে যখন ক্ষমতা গেছে কোন না কোন ভাবে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন শাসক বিভিন্ন ভাবে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পরিত্যাগ করে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং বললেন এটাই সবচেয়ে উন্নত গণতন্ত্র। আবার শেখ হাসিনা প্রায় দীর্ঘ ১৭ বছর শাসন ও পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) করে দেখায়ে দিয়েছেন গণতন্ত্র কাকে বলে!
সুগঠিত গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি না হওয়ার পরিবেশ পাকিস্তান আমল থেকে। ১৯৪৭ সালে দেশ গঠন হলেও সংবিধান আসে ১৯৫৬ সালে এবং প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে যেটা শেষ পর্যন্ত ৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। পাকিস্তান আমলে একটা বিতর্ক ছিল ধর্ম নাকি গণতন্ত্র। ধর্মের নাম করে গণতন্ত্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। শেষ কি হল, ধর্মের কোনো উপকারও হলো না, আবার গণতন্ত্রও হলো না। গণতন্ত্র যদি কিছুটা থাকত তাহলে অন্তত ধর্মের কিছুটা উপকার হতো।
আশা করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এদেশে গণতান্ত্রিক চর্চার আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র সেই পূর্বের শনির দশা থেকে বের হতে পারিনি। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হলো। চেপে বসল সমাজতন্ত্রের ভূত। নিষিদ্ধ হলো সব রাজনৈতিক দল, চালু হলো বাকশাল। একপর্যায়ে গণতন্ত্রও হলো না, সমাজতন্ত্রও হলো না। এভাবেই দেশে একপর্যায়ে চালু হলো নিয়ন্ত্রিত বা সিস্টেমের গণতন্ত্র।
বিজ্ঞাপন
এটাই এ দেশের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, ক্ষমতাসীন বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়না। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার এক ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। ভোটার থাকতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া, পাতানো নির্বাচন, রাতের ভোট, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, ভোট ম্যাকানিজম, বন্দুকের নল, বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে সিল মারা, ভূতুড়ে ভোট, গায়েবি ভোট, টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, বিরোধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াসহ নানা ঘটনা বারবারই এ দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এরশাদ সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার আশায় ১৯৯১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ত্রুটি দেখিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের ওপর ভর করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটা বাতিল করা হয়। ফলে যে তরি চড়ে আ. লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল, সেটা আর থাকল না। বিরোধী দলগুলো অনেক প্রতিবাদ আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। আবার দেখা যায় একটি দল ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রথমে রাজি ছিল না, পরে বিরোধীদের চাপে সংসদে পাশ করে। আবার বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির মাধ্যমে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ ওঠে ছিল।
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠতে দেখা যায়। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের একটি বিশেষরূপ। জনগণকে মুলা দেখায়ে জনগণের উপর ভর করে ক্ষমতায় এসে জনগণের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, ভোটের অধিকার হরণ করে। ফ্যাসিবাদ নিজের দোষ স্বীকার করে না, মনে করে তারা যেটা করছে, সেটাই সঠিক। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ত্রুটি হচ্ছে কেউ ভুল স্বীকার করে না, আর অতীত থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। এত গুম-খুন আর অপকর্মের পর ভুল স্বীকারের ব্যাপারে আ. লীগের কোন নৈতিকতাবোধ দেখা যাচ্ছে না। আবার অন্য অনেক দল তাদের ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যেতে চায়।
আরও পড়ুন
এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
নানারকম নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য গণতান্ত্রিক পরিসরকে খর্বই করে চলেছে। একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ও সংসদে বা দেশে সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল খুবই আবশ্যক। বিরোধী দলগুলো জনগণের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে সরকারের কাছে তুলে ধরে, সরকারের ভুলত্রুটি দেখায়ে দেয়, প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনে এবং নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখে। প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা আ. লীগ বিরোধীদের একেবারে শেষ করে দিতে চেয়ে ছিল। যে ভাবে বিরোধীদের ধরাশায়ী করেছিল, মৃত্যুকূপ থেকে জীবন ফিরে পাওয়া সেই বিরোধীরা সেই দলকে এখন ছাড় দিতে নারাজ। আবার এমন সব ঘটনা ঘটেছে নৈতিক বিবেচনায় কোন ব্যক্তি আ. লীগকে ছাড় দিতে বলতে পারে না।
দেখা যায় রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তো দূরের কথা বরং হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি একে অপরকে বিনাশ বা উচ্ছেদ করার অপচেষ্টার মতো কাজে ব্যস্ত থাকে। একই আকাশ, বাতাস, মাটি, পথঘাট, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, বলতে গেলে একই সংসার। ঘুমানোর আগে যেমন সবার সাথে সবার দেখা হয়, আবার রাত পোহালেই আবার সেই একই মুখ। কেউ কাউকে যেন সহ্য করতে পারে না। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। ভিন্ন ভিন্ন মত, বহুকণ্ঠ ও বিতর্ক গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে পড়ে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আমাদের অন্য মতের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তর্ক-বিতর্ক মেনে নিতে হবে।

আমাদের একটা অন্যত্তম দুর্বলতা আমাদের নিজেদের বিষয় নিয়ে বিদেশিদের কলকাঠি নড়াতে ও মাথা ঘামাতে দেওয়া। একে অপরকে শায়েস্তা করার জন্য, ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা থেকে কাউকে সরানোর জন্য বিদেশিদের সাথে হাত মেলানো যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া হয় জাতীয় স্বার্থ। বিদেশ থেকে একটা ফর্মুলা বা সিস্টেম আসে আর তারপর সেই মোড়কে আটকানো হয় এদেশের জনগণকে।
নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে বহুবার বাধার সৃষ্টি হয়েছে এবং বহুবার নির্বাচন কমিশনের উপর এদেশের মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনাররা সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন। কিন্তু দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া কমিশনাররা নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ও শপথ ভঙ্গ করে বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করেছেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তা ও নির্বাচনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন অবান্তর।
আমাদের নির্বাচন সংস্কৃতিতে অনাস্থা সৃষ্টি করার মতো ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। যে দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়, তারা প্রত্যেকেই জয়ী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে। যে দল পরাজিত হয়, সেই দল অবধারিতভাবেই নির্বাচনে কারচুপির কথা বলে। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার গণতন্ত্র কোনও চূড়ান্ত সুরক্ষাকবচ নয়। কেবল একটি কাঠামো। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের আয়োজন করা নয়, গণতন্ত্রের অন্য সব বড় বৈশিষ্ট্য গুলো যদি না থাকে তাহলে গণতন্ত্র হয় না। আমাদের দেশে একের পর এক ভোটের আয়োজন করা হয়েছে, বড় বড় বাজেটের ভোট হয়েছে কিন্তু গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো চর্চার অভাবে গণতন্ত্রকে সুগঠিত রুপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গণতন্ত্র শুধু যে রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সব কিছু প্রত্যাশা এমনটা নয়, নাগরিকের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে যুক্তিবাদী চিন্তা, ধৈর্য, সহনশীলতা। এগুলোর চর্চা খুবই প্রয়োজন। তা নাহলে ভোট, সংসদ, আইন, গণতন্ত্রের কাঠামোটুকুই টিকে থাকে, জীবনটা থাকে না। রোজ়েনবার্গের মতে, ‘গণতন্ত্র’-এর প্রকৃত চেহারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, চাই এমন শিক্ষা যা নাগরিককে শেখায় যুক্তিবোধ, সহানুভূতি আর নৈতিক পরিপক্বতা। না হলে, জনতা ধরা পড়ে সস্তা সমাধানের ফাঁদে।
এই যখন বাস্তবতা তখন ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। নানা ঘটনা ও অবস্থার মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সাথে ঐদিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে যেখানে পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য সমর্থন চাওয়া হবে। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, অংশগ্রহণকারী দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষপূর্ণ কাজে লিপ্ত।
হয়ত নির্বাচনের আয়োজন ও পরিবেশ নিয়ে কারোর অসন্তোষ থাকতে পারে, তবে দেশের বাস্তবতায় ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের বিকল্প কিছু নেই। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার আসবে এবং সেই সরকার সুচিন্তিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে দেশকে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে নিয়ে যাবে এটাই কাম্য। বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব-সহিংসতা-অসন্তোষ-অরাজকতা-অস্থিতিশীলতা কাম্য নয়। এগুলো বারবার ঘটতে বা চলতে থাকলে একটা দেশ ধীরে ধীরে একটি সংঘাতময় ও অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকেই চলে যায়, এটাই বিষয়।
প্রাচীন কালে সক্রেটিস ও থুসিডিদিস, মধ্যযুগে সেন্ট অগাস্টিন ও সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাস ও আধুনিক যুগে থমাস হবস, জাঁ জাক রুশো, এডমন্ড বার্ক, ফ্রিডরিখ নিটশে ও গায়েতানো মোস্কাসহ প্রমুখ দার্শনিক গণতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। তবে যে যাই সমালোচনা করুক গণতন্ত্র ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমান পৃথিবীতে খুবই কম। নিদিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন আর ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা ভালো পরিবেশ খুবই আবশ্যক। এমন বাস্তবতায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রত্যেক প্রার্থী, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সর্বোপরি প্রত্যেক নাগরিক গণতান্ত্রিক আচরণ করে সুগঠিত গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরির করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৪ সালের তিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের মতে, কোনও দেশে গণতন্ত্র থাকলে, সে দেশে দেরিতে হলেও সমৃদ্ধি আসে। আমরা যেন সেই পথে থাকতে পারি, সেটাই প্রত্যাশা।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

