শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

রক্তার্জিত ত্রয়োদশ সংসদ নিয়ে জনতার প্রত্যাশা অসীম

মেশকাত সাদিক
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

sagsad
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু। ছবি: সংগৃহীত

সুদীর্ঘ ১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী ও গণতন্ত্রহীন শাসন শোষণের পর বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এটি একটি ব্যতিক্রমী সংসদ অধিবেশন। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি-রেওয়াজ অনিবার্যভাবে অনুসরণের পথ ছিল রুদ্ধ। সাধারণত বিগত বিদায়ী সরকারের সংসদের অভিভাবক স্পিকার বা তার অবর্তমানে ডেপুটি স্পিকার নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর পদত্যাগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত সরকারের স্পিকার পলাতক বা নিখোঁজ এবং ডেপুটি স্পিকার ফৌজদারি মামলায় কারান্তরীণ থাকায় বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংসদ নেতা সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে জ্যেষ্ট একজন সংসদ সদস্যকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করলেন। তিনি হলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, এমপি। তিনি কার্যপ্রণালীর বিধি অনুযায়ী বীরমুক্তিযুদ্ধা হাফিজ উদ্দীন আহমেদকে স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটিতে দিলে দুইজনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হলেন। এরপর রীতি অনুযায়ী তিনি ৩০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতুবি ঘোষণা করলেন এবং এরপরই নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে আবার সংসদ অধিবেশন শুরু হলো।

এই সংসদ অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানের ১৫০০ শহীদ এবং প্রায় ৫০ হাজার আহত মানুষের রক্ত এখনো রাজপথে হাহাকার করে। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার বিনা বিচারে কারাবাসের ইতিহাস দগদগে ঘা হিসেবে জাতির কাছে ভাস্বর। জগত খ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা সাঈদী হুজুরের চিকিৎসার নামে ফ্যাসিস্ট কর্তৃক হত্যাকাণ্ড জাতির কাছে আজও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়াও জুলাই মাসের সেই দিনগুলো আজও মানুষের স্মৃতিতে রক্তাক্ত অক্ষরে লেখা হয়ে আছে। উত্তাল জনসমুদ্র, শ্লোগানের বজ্রধ্বনি আর প্রতিবাদের আগুনে জ্বলতে থাকা রাজপথ; সবকিছু মিলিয়ে যেন পুরো দেশ এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল তাদের অধিকার আর ন্যায়ের দাবিতে। ইনসাফ আর গণতন্ত্রের দাবিতে। কিন্তু সেই দাবির মূল্য দিতে হয়েছিল রক্ত আর অশ্রু দিয়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের অলিগলি থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। কারও হাতে ব্যানার, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, আবার কেউ কেবল বুকভরা সাহস নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। তাদের কণ্ঠে ছিল স্বাধীনতার গান, অধিকার আদায়ের শপথ।


বিজ্ঞাপন


কিন্তু সেই স্বপ্নময় মুহূর্ত খুব দ্রুতই রূপ নেয় ভয়াবহতায়। রাজপথে হঠাৎ করেই নেমে আসে দমন-পীড়নের কালো ছায়া। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় আকাশ ভারী হয়ে ওঠে, লাঠির আঘাতে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে মানুষের মিছিল। অসংখ্য গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে শহর। হেলিকপ্টার থেকে নিজ দেশের জনতার উপর মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ করা হয়। মুহূর্তেই আনন্দ আর আশার জায়গা দখল করে নেয় আতঙ্ক আর শোক। ফারহান ফাইয়াজ বা আনাস। আবু সাঈদ বা মীর মুগ্ধ। ইয়ামিন বা রিয়া গোপ। কার কথা বলবো।  প্রতিদিন শত শত লাশের মিছিল।  হাসপাতালের করিডোরগুলোতে তখন কান্নার শব্দ। আহতদের আর্তনাদ। স্বজন হারানো মানুষের গগণবিদারি বিলাপ। সব মিলিয়ে ভয়াবহ এক বেদনাময় দৃশ্য। কত মায়ের বারংবার জিজ্ঞাসা, ‘আমার ছেলেটা কোথায়?’ কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না কেউ। কারণ সেই ছেলেটি আর কখনো ঘরে ফিরবে না। এমনই সময় পার করেছে বাংলাদেশ ২০২৪ এর জুলাই মাসে।

আরও পড়ুন

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই মূলমন্ত্রে জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমান

এমনি লাশের পাহাড় আর রক্তনদী পেরিয়ে আজকের গণতান্ত্রিক সংসদ শুরু হলো। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী-বিরোধীদলীয় নেতাসহ যারাই সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন সবার বক্তব্যই ছিল গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক এবং অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। এমন মানবিক সংসদই বাংলাদেশের মানুষ চায়। ১৯৯১-১৯৯৬ সালের এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬-২০০১ ও তৎপরবর্তীতে ২০০১-২০০৬ এই ৩টি সংসদ ছিল বেশ কার্যকর। বলাবাহুল্য বিএনপির ২টি আমল ৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ এই দুটি সংসদই ছিল বাস্তবিক অর্থে কার্যকর ও জনমুখি। আওয়ামী লীগ বরাবরই কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ায় তাদের কোনো আমলেই সংসদ কার্যকর হয় না। এবারও বিএনপির সরকার। তাই জনতার প্রত্যাশা, সংসদ হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। আমলাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে কার্যকর সংসদের বিকল্প নেই।

Sangsad2


বিজ্ঞাপন


এবারের সংসদ ঐতিহাসিকভাবে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ নিচ্ছে। কারণ দেশ স্বাধীনের পর যেমন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য হতে সংসদ নেতা একজনকে সভাপতি নির্বাচিত করে সংসদ পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন। এবারও তাই হলো। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থান বিরোধীরা যাই মনে করুক না কেন ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর দেশ নিঃসন্দেহে নতুন বাংলাদেশ। এই সংসদের কিছু নিরেট সত্য দেশবাসিকে মানতেই হচ্ছে। তা হলো তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ ‍ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত আসামি এ টি এম আজহারুল ইসলাম রংপুর থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তিনি নির্বাসিত ছিলেন। তাকে নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার এমন কোনো প্রোপাগান্ডা নেই যা ছড়ায়নি। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম এবং কিছু কিছু বাংলাদেশ বিরোধী বীজে জন্মলাভ করা গণমাধ্যমও প্রতিযোগিতামূলকভাবে তার চরিত্র হনন করেছে। এই ক্ষেত্রে তাকে দুর্নীতিবাজ অভিধায় ভূষিত ও দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত করার জন্য টিআইবি-ও তাদের কার্টুনে এই নেতার প্রতিলিপি বানাতেও পিছপা হয়নি।

আরও পড়ুন

আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার গতিপথ

এই সমস্ত বাংলাদেশ বিরোধী সংস্থার সাথে দেশের শত্রু এইসব কতিপয় গণমাধ্যম স্বাধীনতার মহান ঘোষককেও বিতর্কিত করেছে প্রতিনিয়ত। আপসহীন দেশনেত্রী বাংলাদেশের নিউক্লিয়াস ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে নিয়েও সীমাহীন মিথ্যাচার করে, অপপ্রচার চালিয়ে এইসব সংঘবদ্ধ চক্র কারাবাসের উপযুক্ত করে তোলে। [যদিও তারা এখন বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিবিদদের তৈল মর্দনে ব্যস্ত]। এমন বিরূপ ও প্রতিকূল পরিবেশকে বিএনপির চেয়ারম্যানের স্বাভাবিক ও দেশে ফেরার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে। তিনিও সংসদে আজ অসাধারণ ভাষণের মাধ্যমে দেশ-জনতাকে জানান দিয়েছেন যে, সবার আগে বাংলাদেশ। এই সংসদরে একটি হাস্যকর দিক হলো, যে রাষ্ট্রপতি বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রের সহযোগী, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রাজাকার ফতোয়া দেওয়া নব্যরাজাকার আওয়ামী লীগের চেতনার বীজে সুখানুভব করেন, তিনিও আজ আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বললেন। জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষকও বললেন। এর থেকে প্রমাণিত হয়, দাদা বাবুরা সব পারে। ঘাড় ধরতে পারে। ঘাড় শক্ত হলে সাথে সাথে পা-ও ধরতে পারে। অসাধারণ যোগ্যতা রপ্ত করেছে। ছি!!

জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণে সরকার ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন জনগণ মানবে না। কারণ আশ্চর্যের বিষয়, জুলাই গণহত্যার ভয়াবহতার মাঝেও এই ছাত্র-জনতা সাহস ভাঙেনি। রক্তাক্ত রাজপথে দাঁড়িয়ে তারা শপথ নিয়েছিল- ‘শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবে না।’ স্বপ্ন নিয়ে তারা পথে নেমেছিল, সেই স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই বেদনার ইতিহাস, অদম্য সাহসের গল্প। এখানে আছে তরুণ প্রাণের আত্মত্যাগ, মায়ের বুকভাঙা কান্না, আর বাঙালি জাতির অদম্য সংগ্রামের কাহিনি। তাই জুলাইয়ের স্বপ্নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ত্রয়োদশ সংসদকে।

লেখক: কলামিস্ট ও কবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর