বিশ্বের পোশাক সরবরাহ চেইনে এক নীরব কিন্তু গভীর রূপান্তর শুরু হয়ে গেছে। এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে ধীরে, কিন্তু এর অভিঘাত হবে দীর্ঘস্থায়ী। এক সময় যেসব বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ডের প্রধান উৎপাদন ভরসা ছিল বাংলাদেশ, আজ তারাই ধাপে ধাপে সেই নির্ভরতা সরিয়ে নিচ্ছে। Zara, Marks & Spencer, H&M-এর মতো ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ জায়ান্ট ব্র্যান্ডগুলোর ভারতমুখী ঝোঁক সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি নিছক কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গভীর সতর্ক সংকেত।
কেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বিশ্ব?
বিজ্ঞাপন
গত প্রায় ১৮ মাসে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২। শ্রম অসন্তোষ, ৩। বারবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ৪। সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা। এই চারটি মৌলিক বিষয় একত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা দুর্বল করেছে।
বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো ডেলিভারি, উৎপাদন ধারাবাহিকতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা। কিন্তু এই জায়গায় বাংলাদেশ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ব্র্যান্ডগুলো বাধ্য হচ্ছে বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে।
কিন্তু ভিয়েতনাম বা চীন বাদ দিয়ে, ভারত কেন? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ভারতের সাফল্যের মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ করণীয় লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ ব্যবসায় প্রতিযোগীর কৌশল থেকে নিজের কৌশল শিখতে হয়।
বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের শুরু থেকেই ভারত সরকার, ভারতের শিল্প উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা একটি সমন্বিত কৌশল নিয়ে এগিয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন, বড় আকারের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। সবকিছু একসঙ্গে সমন্বিতভাবে ঘটেছে।
ফলাফল হিসেবে মাত্র এক বছরের মধ্যে ভারতের টেক্সটাইল খাতে নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৬,০০০ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড বা ৮,১৬০ কোটি মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক ব্র্যান্ড নির্বাহীরা নিয়মিত সফর করছেন ভারতের কোয়েম্বাটুর, তিরুপ্পুর, সুরাট, আহমেদাবাদ, লুধিয়ানা, জয়পুর, নয়ডা ও দিল্লি–এনসিআর অঞ্চলে। এগুলো নিছক সৌজন্য সফর নয়, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সোর্সিং হাব কমিটমেন্টের স্পষ্ট বার্তা।
ভারতের শক্তি বনাম বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা:
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মূল শক্তি এখনো কম দামের Ready-Made Garments (RMG)। এটি আমাদের সাফল্যের ভিত্তি হলেও একই সঙ্গে একটি সীমাবদ্ধতাও বটে। কারণ বৈশ্বিক বাজার এখন দ্রুত এগোচ্ছে ভ্যালু অ্যাডেড ও প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্রের দিকে।
ভারত সেখানে এক ধাপ এগিয়ে। তারা একসঙ্গে উৎপাদন করছে- (High-end fashion apparel) উচ্চমানের ফ্যাশন পোশাক, (Technical textiles) প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র, (Medical textiles) চিকিৎসা বস্ত্র, (Defence fabrics) প্রতিরক্ষা খাতের বস্ত্র, (Sports & specialty textiles) ক্রীড়া ও ক্রীড়া ও বিশেষায়িত বস্ত্র। অর্থাৎ ভারতের আছে End-to-End Capability, কাঁচামাল থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যের চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত এক ছাতার নিচে।
ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট: এটাই কি তবে শেষ পেরেক?
১। আসন্ন ভারত–যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (India–UK FTA): ভারতের পোশাক রফতানির প্রায় ৯৯ শতাংশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা।
২। সম্ভাব্য ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (India–EU FTA): পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যে ৯–১২ শতাংশ শুল্ক হ্রাস হতে পারে।
এর ফলে বাংলাদেশের বহুদিনের ট্যারিফ সুবিধা কার্যত শেষ হয়ে যেতে পারে।
চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা:
চীন তার পোশাক শিল্পকে কেবল শ্রমনির্ভর খাতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভারী যন্ত্রপাতি, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ফলে চীন কম দামের পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তির বস্ত্রেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভারতও একই পথে হাঁটছে।
চীন ও ভারত ডিএফআই (Development Financial Institution)-এর সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে অর্থায়ন দিয়ে শিল্পকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়:
বাস্তবতা কঠিন কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই। এই পরিবর্তন কোনো সাময়িক পরিবর্তন নয়। এটি একটি গভীর কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস, যেখানে বিভিন্ন সুবিধা ও ঝুঁকির কারণে বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ চেইন স্থায়ীভাবেই নতুন গন্তব্য বেছে নিচ্ছে।

আজ বাংলাদেশের সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন:
১। আমরা কি নীতি সংস্কার করব?
২। আমরা কি শ্রম পরিবেশ স্থিতিশীল করব?
৩। আমরা কি ভ্যালু অ্যাডেড টেক্সটাইলের পথে হাঁটব?
নাকি চোখের সামনে একের পর এক অর্ডার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হাতছাড়া হতে দেব?
বাংলাদেশের শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষায়িত ডিএফআই প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা, ডিএফআই (Development Finance Institution) হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। ঠিক সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এখন প্রয়োজন পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি বিশেষায়িত ডিএফআই।
এই ডিএফআই যদি চীন ও ভারতের মতো ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সহায়তা করে
উচ্চমানের ফ্যাশন পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর, চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা ও বিশেষায়িত বস্ত্র উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেয়, তবে বাংলাদেশের পক্ষেও End-to-End Capability অর্জন করা সম্ভব হবে।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’ সুতরাং এখনই কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত না নিলে, এর মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে।
লেখক: ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি

