পটভূমি
বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় আগামী ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ ‘টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৫’। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি/সমমান পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিকা পাবে, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানবহির্ভূত ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্রে টিকা নিতে পারবে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে, ইপিআই ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সহায়তায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন (এসএসএফ) ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কওমি মাদরাসায় টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিন মাসব্যাপী দুটি গবেষণা সম্পন্ন করেছে।
গবেষণায় সাক্ষাৎকার, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা (FGD), এবং অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মতামত ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি: বৈশ্বিক সাফল্যের গল্প ও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে
১৯৮৫ সালে সারাদেশে চালু হওয়ার পর থেকে ইপিআই শিশুমৃত্যু ৮১.৫% কমাতে সক্ষম হয়েছে-যা মাত্র ছয়টি দেশ অর্জন করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও ও ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ, এবং ৯৩% HPV টিকা কভারেজ অর্জিত হয়েছে। ডিজিটাল উদ্ভাবন যেমন VaxEPI, e-Tracker, GIS Microplanning ও e-VLMIS ইপিআইকে করেছে আধুনিক ও দক্ষ। তবে সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ-নগর এলাকায় টিকাদান কাভারেজ ধরে রাখা, স্কুল ও মাদরাসা-ভিত্তিক টিকা কার্যক্রমে আস্থা তৈরি করা, এবং ভ্যাকসিনবিরোধী বিভ্রান্তি মোকাবিলা করা। আগামী ১২ অক্টোবর ২০২৫ থেকে শুরু হচ্ছে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (TCV) ক্যাম্পেইন, যা ইপিআই কর্মসূচির নতুন মাইলফলক হবে। বাংলাদেশের এই সাফল্য প্রমাণ করে-দৃঢ় নেতৃত্ব, কমিউনিটি অংশগ্রহণ ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সমন্বয় ঘটলে, স্বাস্থ্যখাতে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল: সচেতনতা আছে, আস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো সাধারণত স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন-অধিকাংশ স্কুলে ফার্স্ট এইড বক্স, ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী, এমনকি চোখ ও ডেন্টাল ক্যাম্পও থাকে। তবুও ভ্যাকসিন গ্রহণে কিছুটা হেজিটেনসি বা দ্বিধা লক্ষ্য করা যায়। ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, মান ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। অনেকে সরকারি ক্যাম্পেইনের চেয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে টিকা নিতে বেশি স্বস্তিবোধ করেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক অনুমোদন, স্থান সংকুলান, এবং সীমিত প্রচারণা-এসব কারণে কিছু স্কুলে TCV ক্যাম্পেইনের দৃশ্যমানতা কম ছিল। শিক্ষক ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি টিকা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাননি, এবং অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া টিকা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না-যা একটি বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
কওমি মাদরাসা: ধর্মীয় শিক্ষা শক্তিশালী, স্বাস্থ্য সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম
কওমি মাদরাসাগুলোতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা শক্তিশালী হলেও, টিকা ও সাধারণ স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। বেশিরভাগ মাদরাসায় ফার্স্ট এইড কিট নেই, স্বাস্থ্যসেবা মূলত স্থানীয় ক্লিনিক বা ফার্মেসিনির্ভর। টিকাদান ক্যাম্পেইনের অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত, বিশেষত COVID-19 বা HPV টিকা ছাড়া।
এখানে টিকা সংক্রান্ত তথ্য ও প্রচারণার ঘাটতি, নারী-পুরুষ ভ্যাকসিনেটরের অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা, এবং অনলাইনে নিবন্ধনের সীমাবদ্ধতা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে টিকা নিয়ে ভুল ধারণা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও প্রচলিত আছে। ছোট মাদরাসায় স্থান, অনুমোদন ও সমন্বয়ের ঘাটতি টিকাদান কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাধানের পথে: আস্থা, সংলাপ ও সমন্বয়
টাইফয়েড টিকাদান সফল করতে সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থা গড়া ও খোলা সংলাপ নিশ্চিত করা।
* সরকার থেকে অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে ক্যাম্পেইনের সময়সূচি জানানো,
* DGHS/EPI ফোকালপারসন নিয়োগ ও নিয়মিত যোগাযোগ,
* শিক্ষক, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির জন্য ওরিয়েন্টেশন সেশন আয়োজন,
* ভ্যাকসিনের উপকারিতা, নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি,
* শিক্ষার্থীদের সুবিধাজনক সময়ে টিকাদান আয়োজন,
* অনুপস্থিতদের জন্য বিকল্প EPI সেন্টার ব্যবহার—এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ধাপে ধাপে সেশন এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য পার্শ্ববর্তী স্কুলের সঙ্গে সমন্বয় করলেই কভারেজ বাড়বে। গুজব প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নিতে হবে।
অগ্রগতি: একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া
ইতোমধ্যে সরকার ক্যাম্পেইনের সময়সূচি ও নির্দেশনা সকল প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছে। DGHS/EPI ও স্থানীয় ফোকাল পারসনরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছেন। শিক্ষক, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির জন্য ওরিয়েন্টেশন সেশন সম্পন্ন হয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম ক্লাস চলাকালীন বা শিক্ষার্থীদের সুবিধামতো সময়ে আয়োজন করা হচ্ছে, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প কেন্দ্রও রাখা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩, ডিজিটাল প্রচারণা, সংবাদ সম্মেলন ও মিডিয়া সম্পৃক্ততার মাধ্যমে টিকাদান ক্যাম্পেইনের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে-যা আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের মধ্যে টিকা বিষয়ে সচেতনতা, আস্থা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বিত প্রচেষ্টা—এই তিন স্তরের সহযোগিতাই পারে টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৫-কে জাতীয় সফলতার এক নতুন মাইলফলকে পরিণত করতে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
চেয়ার, গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটি




