পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মের লোক বেশি বসবাস করে। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সহাবস্থান খুবই কম আছে। বাংলাদেশে দেখা যায় একই গ্রাম, একই পাড়া বা মহল্লায় বংশ পরম্পরায় বাস করে আসছে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। একই আকাশ-বাতাস, ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, স্নানের পুকুর, হাটবাজার, খাবারের দোকান, পানীয় জলের উৎস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল—সবই একই। কোনো সমস্যা নেই, দুই সম্প্রদায়ের লোকই যুগের পর যুগ ব্যবহার করে চলেছে। তবে কোনো সময় কোনো সমস্যা হয়নি—এমনটাও বলা যাবে না। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধর্ম নয় বরং এমন সব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাই প্রধান থাকে। ধর্মকে কিছু লোক কাজে লাগিয়ে থাকে।
উন্নয়ন ও শান্তির জন্য সকল মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি অপরিহার্য। হিংসা-হানাহানিতে কেবল উন্নয়ন বিঘ্নিত হয় আর দারিদ্র্য বাড়ে। সমাজে শান্তি না থাকলে মানুষ ধর্মও ঠিকমতো পালন করতে পারে না। পৃথিবীর অনেক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যেমনটা দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
বংশ পরম্পরায় শুধু এক জায়গায় মিলেমিশে বসবাস নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে অনেক ঐক্য রয়েছে। দেশের জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত হয়ে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকও জীবন দিয়েছিল। উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ১৯৪৭ সাল। এই সময় কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ভারতে চলে গেলেও অন্যদের সবার একটাই কথা ছিল, আমাদের প্রতিবেশী মুসলিমরা যে দিকে যাবে, আমরাও সেই দিকে যাব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার রয়েছে।
ধর্ম ও ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক সময় একে অন্যের সম্প্রদায় সম্পর্কে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে।
ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে, ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তিকে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না এবং প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, দ্বীনের (ধর্মের) মধ্যে কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি নেই (সুরা বাকারা, আয়াত-২৫৬)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, লাকুম দীনুকুম ওলিয়া দীন (তোমার জন্য তোমার ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম)।
পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। তোমরা প্রজ্ঞা ও উত্তম ভাষার মাধ্যমে ধর্মের কথা বলো। মহানবীর কথা—‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করোনা, পরাজিত হবে’।
বিজ্ঞাপন
ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে, ইসলাম ধর্মে প্রতিবেশীর (সে যে ধর্মের লোক হোক না কেন) প্রতি অনেক দায়িত্ব আছে। সকলের উচিত তাদের সুখ-দুঃখ ও আচার-অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা।
জানা যায়, মহানবীর সময় একজন ইহুদি ধর্মের অনুসারী ব্যক্তির বাড়ির মূল্য বাজারদর থেকে চারগুণ বেশি উঠেছিল। এর কারণ ছিল তিনি একজন সাহাবীর বাড়ির কাছে থাকতেন। উক্ত সাহাবী প্রতিবেশী ইহুদি ধর্মাবলম্বী লোকটি ঠিকমতো ধর্ম পালন করতে পারছেন কিনা—এ সব খোঁজখবর নিতেন ও সব কাজে সহযোগিতা করতেন এবং উক্ত ব্যক্তি অতি নিরাপদে বসবাস করতেন। উল্লেখযোগ্য যে, সব ধর্মের লোকদের নিয়ে মহানবী (সা.)-এর মদিনায় রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা।
অন্যদিকে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে, হিন্দুধর্মেও অন্য ধর্মের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করা হয়েছে। শান্তি ও মানবকল্যাণকে উচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। সন্ন্যাসী ও দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে (১৮৯৩) হিন্দুধর্মের বৈদান্তিক রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে প্রথমে সহজভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেছিলেন, যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমত সহিষ্ণুতা ও সর্ববিধ মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়ে আসছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকে সহ্য করি না, সকল ধর্মকেই স্বীকার করি।
তিনি আরও বলেছিলেন, হিন্দুধর্ম দুটো জিনিস শিখিয়েছে—সহনশীলতা আর বহনশীলতা। শুধু সইব না, সঙ্গে করে নিয়ে বেড়াব। হিন্দুধর্ম সব ধর্মকে শুধু মেনে নেয় না—টেনেও নেয়। হিন্দুধর্ম এও শেখায় যে সর্বধর্মই সমান মহান।
একই রক্তের ধারা
হিন্দু ও মুসলিমদের ধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের এই দুই সম্প্রদায়ের লোকেরা যে একই জনগোষ্ঠীর—এ বিষয়ে কারোর দ্বিমত থাকার কথা নয়। সবার দেহে একই রক্ত প্রবাহিত। আমরা যদি পেছনের দিকে যেতে থাকি তবে এক সময় হয়তো পূর্বপুরুষদের মিল পাওয়া যাবে।
এটাই সত্য যে, বাংলার নিভৃত পল্লীতে যে স্থানীয় অনার্য জনগোষ্ঠী বা আমাদের পূর্বপুরুষরা বাস করত, তারা প্রথমে কেউ হিন্দু বা মুসলিম ছিল না। একসময় তাদের কেউ হিন্দু হয়, কেউ মুসলমান। বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুরা উভয়েই এই দেশের ভূমিপুত্র।
আরও পড়ুন: উপমহাদেশে সিস্টেম চেঞ্জের ঢেউ
কিন্তু আমাদের মধ্যে আত্মপরিচিতির একটা সংকট দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। একসময় হিন্দু সমাজব্যবস্থায় লক্ষণীয় ছিল, যারা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ—অর্থাৎ যারা কনৌজ-মিথিলা বা উত্তর ভারত থেকে এসেছে, তারাই ছিল সমাজে বেশি সম্মানিত। যে কারণে একসময় সবাই বংশপরিচয় নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তবে, সম্প্রতিকালে হাড়গোড় ও অন্যান্য আধুনিক নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলায় যারা ব্রাহ্মণ বলে দাবি করে তাদের সঙ্গে কনৌজ-মিথিলা বা উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণদের থেকে স্থানীয় লোকদের মিল বেশি। খোদ ব্রাহ্মণের যখন এই অবস্থা, তখন অন্যদের নিয়ে আর বলার কিছু থাকে না।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথম দিকের বৈদিক গ্রন্থসমূহে ব্রাহ্মণদের পূর্ব দিকের সীমানা দিল্লির পাশে যমুনা নদী পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পূর্ব দিকের সীমানা বিহার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বাংলায় বসবাস ও পূজা করার অনুপযোগী এই ব্যাখ্যা থেকে সরে এসে ব্রাহ্মণরা একসময় বাংলায় আগমন শুরু করে। তবে অনেকে স্থায়ী হতো না, দেখেশুনে ধর্ম প্রচার করে আবার ফিরে যেত।
উত্তর ভারত থেকে যেসব ব্রাহ্মণ বাংলায় এসে স্থায়ী হয়ে যেত, তারা আবার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এখানেই ঘর-সংসার শুরু করত। তাদের সবাই বউ বা স্ত্রী সঙ্গে করে নিয়ে আসত—এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। এ থেকে প্রমাণ হয় যে বাংলায় যারা মা হয়েছে তারা সবাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ছিল। যে কারণে বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ ভাষা ও সংস্কৃতিতে মায়েদের প্রভাব থেকেই যায়।
বাজারে প্রচলিত সবচেয়ে গৎবাঁধা ব্যাখ্যা মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিছু লোক মনে করে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হয়েছে অভিবাসনের কারণে। অর্থাৎ ইরান, তুরান (মধ্য এশিয়া) ও আরব থেকে এসে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে। কেননা গানে আছে না—ইরান, তুরান পার হয়ে আজ তোমার দেশে এসেছি।
যে কারণে মুসলিমরা একসময় নিজেদের ইরান-তুরান–আরব-বাগদাদের পীর-ফকির, রাজাবর্গ ও তাদের অনুচর ও সিপাহীদের বংশধর প্রমাণে মহাব্যস্ত ছিল।
তবে যৌক্তিক ব্যাখ্যাকারীদের মতে, রাজাবর্গ ও তাদের সঙ্গে যারা এসেছে বা ধর্মপ্রচারকদের বংশধরদের মাধ্যমে মুসলমান জনগোষ্ঠী বেড়েছে ঠিকই, তবে তা কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়।
ব্রাহ্মণদের মতো যে সব বহিরাগত মুসলিমরা এসেছিল, তারা সবাই বউ বা স্ত্রী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল—এমনটা কমই শোনা যায়। তারাও স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে ঘর-সংসার করত।
তাছাড়া যেসব বহিরাগত মুসলিমরা এসেছিল, তারা ছিল মূলত নগরকেন্দ্রিক। পুরোনো রাজধানীগুলোর চারদিকে জড়ো হয়ে বসবাস করত। প্রত্যন্ত গ্রামে তারা যেত না এবং পেশা হিসেবে কৃষি ছিল তাদের অপছন্দের। আবার একটা বড় অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি করে ফিরে যেত। বাংলা এতই দুর্গম ও সুযোগসুবিধার অভাব ছিল যে বাইরের লোক এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারত না। মোগলদের অনেক লোক রোগে মারা গেলে তাদের বাংলা শাসন নিয়ে একসময় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। ইংরেজদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত ছিল two rains অর্থাৎ এক বর্ষা পার করে দ্বিতীয় বর্ষাকাল দেখার সুযোগ অনেকের হতো না।
ইংরেজ আমলের দীর্ঘকাল পর্যন্ত সবার ধারণা ছিল বাংলার অধিকাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ১৮৭২ সালে প্রদেশটির প্রথম আনুষ্ঠানিক আদমশুমারিতে দেখা যায়, সমগ্র বাংলায় প্রায় অর্ধেক এবং পূর্ব বাংলায় অর্ধেকের বেশি মানুষ মুসলমান।
এ বিষয়ে তৎকালীন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তা জেমস ওয়াইজ লেখেন, ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে উদ্ঘাটিত সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি হলো—পুরোনো রাজধানীগুলোর চারদিকে জড়ো হয়ে নয়, বরং বদ্বীপের পাললিক সমতলের নিভৃত পল্লীতে বিপুল সংখ্যক মুসলমান বসবাস করে।
এ বিষয়ে প্রথম উত্তপ্ত বিতর্কের সূত্রপাত ঘটান আদমশুমারির প্রতিবেদনের সংকলক হেনরি বেভারলি। তিনি যুক্তি দেখান, বাংলায় মুসলিম শাসক ও তাদের সঙ্গে আগত লোকদের বংশবিস্তারের কারণে এটা ঘটেনি, বরং স্থানীয়দের ধর্মান্তরের কারণেই এটা ঘটেছে।
এমন বিতর্কের মধ্যে ১৯০১ সালে ভারতে আবার আদমশুমারি হয়। যার প্রতিবেদনে ই. এ. গেইট উপসংহার টানেন, নিজেদের সম্প্রদায়গত পরিচয় জানতে চাইলে বাঙালি মুসলিম কৃষকের দশ ভাগের নয় ভাগই স্থানীয় বংশোদ্ভূত বলে উল্লেখ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত দেন, অভিবাসন আদৌ ঘটেছিল কি না—সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। মুসলিম অভিবাসীরা সাধারণত পুরোনো রাজধানীগুলোর আশপাশে বাস করত, তারা কোনোদিন নোয়াখালী, বগুড়া, বাকেরগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে ধানচাষ করতে বা ঘরবাড়ি বানাতে যেত না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৮৮১ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বাইরের থেকে যেসব রাজাবর্গ ও তাদের সঙ্গে যারা এসেছে তাদের বংশধরদের মাধ্যমে মুসলমান জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এত বেশি হওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয় দরিদ্র কৃষকদের ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে বাংলায় এটা ঘটেছে। স্বামী বিবেকানন্দও একই কথা বলেছেন—বাংলার মুসলমানরা পুরোপুরিই স্থানীয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন (রিচার্ড এম. ইটন নামে পরিচিত) দীর্ঘ গবেষণার পর ১৯৯৩ সালে Rise of Islam and the Bengal Frontier 1204–1760 গ্রন্থটি প্রকাশ করেন।
রিচার্ড এম. ইটন তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসলিম শাসকরা প্রায় ৫০০ বছর বাংলা শাসন করলেও প্রথম ৪০০ বছরে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল খুবই অল্প এবং তারা ছিল নগরকেন্দ্রিক। পূর্ব বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে শেষ ১০০ বছরে।
ইটন দেখানোর চেষ্টা করেছেন, মোগল আমলে পাললিক সমতলের নিভৃত পল্লীর জঙ্গলাকীর্ণ, জলমগ্ন নিম্নভূমিতে বিপুল দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ফলে মুসলিম জনসংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মোগলদের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কিছু পদক্ষেপের কারণে, বিশেষ করে মোগলদের বাংলায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো লোকদের কারণে, যাদের আমরা সুফি-সাধক বা ধর্মপ্রচারক বলে থাকি।
রিচার্ড এম. ইটন তার গ্রন্থে ৫০টি স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন, যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
মোগল আমলে যারা বাংলায় এসেছিল তাদের বলা হয়েছিল, বনজঙ্গল পরিষ্কার করে উদ্ধার করা জমি বিনা খাজনায় বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। তবে এর জন্য শর্ত দেওয়া হয়—মোগল সাম্রাজ্যের গুণগান ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করতে হবে। এর জন্য উপাসনাস্থল (মসজিদ, খানকা, দরগা অথবা মন্দির) বানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। মোগলরা ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ায় হিন্দুরাও এই সুযোগ পেয়েছিল। বিভিন্ন ট্রেজারির পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ ও মোগল আমলের অসংখ্য দলিল পর্যালোচনা করে ইটন এটাও লিখেছেন—এই সময় শুধু ইসলাম ধর্মের সম্প্রসারণ ঘটেনি, হিন্দু ধর্মেরও সম্প্রসারণ ঘটে। তবে মোগল আমলে যারা এই সুবিধা নিয়েছিল তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম, যে কারণে ইসলাম প্রসারে তাদের ভূমিকা ছিল বেশি। হিন্দুরা সংখ্যায় কম আসায় তারা পূর্ব বাংলায় পিছিয়ে পড়ে।
তাছাড়া, সম্প্রতিকালের হাড়গোড় ও অন্যান্য আধুনিক নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এ দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর। বাইরের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের খুব কমই মিল রয়েছে।
১৯৪৭ সালের আগের দশকগুলোতে তিনটি নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। সেসব গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও নমুনা থেকে গবেষকরা সবাই একমত হন যে, বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বহিরাগতদের উত্তরসূরী নন এবং তারা স্থানীয় ও আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর বংশধর।
১৯৩৮ সালে সমীক্ষাগুলোর মাঝে প্রথমটি পরিচালিত হয় চব্বিশ পরগনা জেলায়। সেখানে ইলেন ম্যাকফারলেন উপসংহার টানেন, মুসলমানদের রক্তের গ্রুপের উপাত্ত তাদের সমকালীন হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে বেশি মিল রয়েছে। এর তিন বছর পর আবারও চব্বিশ পরগনা জেলাতেই আরেকটি রক্তের গ্রুপ বণ্টন বিষয়ক সমীক্ষা পরিচালনা করেন বি. কে. চ্যাটার্জি ও এ. কে. মিত্র। এই সমীক্ষাতে তিনি স্থানীয় হিন্দুদের সঙ্গে গ্রামীণ মুসলমানদের মিল দেখান। নগরবাসী বাঙালি মুসলমানদের বহু দূরবর্তী ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের পাঠানদের সঙ্গে কিছুটা মিল দেখান।
পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বঙ্গের পূর্বের সব পরীক্ষা ও সংগৃহীত উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত একটি সমীক্ষা ১৯৬০ সালে প্রকাশ করেন ডি. এন. মজুমদার ও সি. আর. রাও। দলগত বৈচিত্র নির্ধারণে আকৃতি, কপালের প্রস্থ এবং নাকের উচ্চতা ব্যবহার করে এই অনুসন্ধানকারীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব খোঁজা উচিত স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠী এবং তফসিলি অমুসলিম সম্প্রদায়েরই মাঝে। অর্থাৎ, বাংলার মুসলমানরা ভারতের বাইরের মুসলমানদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমনকি উত্তর প্রদেশের শিয়া ও সুন্নিদের সঙ্গেও নয়।
এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, আর্য বা ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস মধ্য এশিয়া। ইরান হলো আর্যের বহুবাচক। প্রকৃত অর্থে ইরান শব্দের অর্থ হলো আর্যদের ভূমি। প্রাচীন ইরানি ও ঋগ্বেদ সংস্কৃতি খুব কাছাকাছি ভাষা। আর্যরা একসময় ইরান-আফগানিস্তান হয়ে ভারত উপমহাদেশে এসে বিকাশ লাভ করেছে। মুসলিমরাও একইভাবে সেই পথে এসেছে—কেউ আগে, আর কেউ পরে।
অতএব ধর্মের নামে অধর্মবিশ, ধর্মের সাথে স্বার্থ মিশিয়ে যেন খারাপ রেসিপি তৈরি না হয় সে বিষয়ে আমাদের সবার সজাগ থাকতে হবে।
আশার কথা, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার এমন কোনো আইন করেনি বা নীতি গ্রহণ করেনি যা অন্য ধর্মের লোক ও সম্প্রদায়ের স্বার্থবিরোধী। ভবিষ্যতেও এটা অব্যাহত থাকবে যাতে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালন করতে পারে ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে—এটাই সবার প্রত্যাশা।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান।
স্বামী বিবেকানন্দ একাধিকবার উল্লেখ করেছেন হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়, প্রেম, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। হিন্দু-মুসলমান সংহতির ক্ষেত্রে উভয় সমাজকেই নিজের পরিচয়ের ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করতে হবে।
বিবেকানন্দের মতে, হিন্দু-মুসলমানের যুগ্ম সাধনাই ভারতবর্ষ তথা বাংলায় এক উন্নত, সুসংহত জীবনের ধারণা দিতে পারে। এসব কথাগুলো আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

