কী অমায়িক, বন্ধুবৎসল, হাসিখুশি ও উদারমনা মানুষই না ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। আমরা দু’জনেই ১৯৬৬ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এখন এটি ‘সরকারি স্কুল’। এ বিদ্যালয়টির সুনাম ছিল সে সময়ের ‘গৌরনদী থানা’ জুড়ে। একটি থানায় (এখন উপজেলা) ৬০ বছর আগে ২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এটা অবশ্যই গর্ব করার মতো বিষয়।
সৈয়দ আবুল হোসেন মাদারীপুরের ডাসার থেকে এ বিদ্যালয়ের টানে ছুটে এসেছিল। থাকত এক আত্মীয়ের বাসায়। প্রতিদিন পরিপাটি হয়ে ক্লাসে উপস্থিত হতো। হাল্কা নীল কিংবা সাদা রংয়ের জামা এবং সাদা পাজামা পরত। চুল সুবিন্যস্ত। কোনো দিন তাকে মলিন মুখে দেখিনি, পোশাকেও কখনও ময়লা লাগতে দিত না।
বিজ্ঞাপন
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মাত্র ২০ সদস্যর মন্ত্রিসভা গঠন এবং সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়ী করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছিল। তবে অপেক্ষাকৃত এক তরুণ নেতা ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসা আওয়ামী লীগের সরকারে মন্ত্রী হওয়ায় দলের মধ্যে কেউ কেউ খুশি হতে পারেনি। তারা নানাভাবে তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছিল, এটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
পড়াশোনায় ভাল ছিল। প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েকটি নতুন ইংরেজি শব্দ সে শিখত এবং অন্যদেরও জানিয়ে দিত। পরীক্ষার খাতায় ইংরেজি ও বাংলা কোটেশন ব্যবহারে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। সে সময় গৈলা স্কুলের সুনাম ছিল—মাধ্যমিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক ছাত্র প্রথম বিভাগ পেত। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এ প্রতিষ্ঠান ছিল এগিয়ে। আন্তঃস্কুল ফুটবলে গৈলা স্কুল একাধিকবার মহকুমা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফনিভূষণ কর্মকার, বিমল দাস, মনীন্দ্র কর্মকার, মোহাম্মদ মহসিন, আবদুর রব এ সব খেলোয়াড়ের নাম গৈলা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের বরিশাল শহরেও পরিচিত ছিল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন >> সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন আর নেই
সৈয়দ আবুল হোসেন যখন গৈলা স্কুলে পড়তে আসে, প্রধান শিক্ষক ছিলেন মতিউর রহমান। তিনি পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেলে অশ্রু কুমার বিশ্বাস আসেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। মোহাম্মদ হানিফ, ফজলুর রহমান লাল মিয়া, নলিনী সিমলাই, জীবন মুখার্জী—এরাও ছিলেন জনপ্রিয় শিক্ষক। ১৯৬৬ সালে গৈলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ৫৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সৈয়দ আবুল হোসেন স্কুলে তাঁর সময় ও পরের সব শিক্ষকের প্রতি সর্বদা ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। যে কোনো প্রয়োজনে তাদের প্রতি বাড়িয়ে দিয়েছেন দরদী, মানবিক সহায়তার হাত। গৈলা স্কুলের সাবেক বা বর্তমান শিক্ষক কিংবা ছাত্রছাত্রী কেবল এ টুকু পরিচয় জানতে পারলেই তিনি তাদের ‘আপনার চেয়েও আপন’ মনে করতেন।
আমি ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হই বিজ্ঞান অনুষদের রসায়ন বিভাগে। সৈয়দ আবুল হোসেন ভর্তি হয় বাণিজ্য অনুষদে। ক্যাম্পাসে প্রথম দিন থেকেই আমি আইয়ুব খানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। বটতলায় আমার বক্তৃতা সে একাধিকবার শুনেছে। কিন্তু কাছে আসেনি। অনেক পরে বলেছে তোমার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। কিন্তু নিজে যেহেতু ছাত্র আন্দোলনে জড়িত হতে চাইনি, তাই দূরে থেকেছি। অথচ আমরা দুজনেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি অংশ নিয়েছি। পরে অবশ্য আমাদের পথ ভিন্ন হয়ে যায়।
এত দ্রুত তিনি বিদায় নেবেন, কেউ ভাবেনি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তাঁর অভাব অনুভূত হবে। ব্যক্তিগতভাবেও কত লোক যে তাকে প্রতিদিন স্মরণ করে কষ্ট পেয়ে বলবে—আহা! আজ যদি সৈয়দ আবুল হোসেন থাকতেন!
সৈয়দ আবুল হোসেন ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুরের কালকিনী আসন থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়। জাতীয় সংসদ লবিতে তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হলে দূর থেকে ছুটে এসে বলেছিল রাজনীতিতে তুমি ছিলে সামনে, আমি পেছনের সারিতে। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। সেই অমায়িক, মনভোলানো হাসি যেমনটি দেখেছি ১৯৬৫-১৯৬৬ সালে। অনেক বছর পর প্রথম দেখাতেই গৈলা স্কুলের পরিচিত অনেক শিক্ষক ও ছাত্রের খবর জানতে চাইল। আমাদের দুজনের সহপাঠী ছিল আবদুল কাদের। স্কুলে থাকাবস্থাতেই দুজনে ঘনিষ্ঠ ছিল, কিন্তু পরস্পরকে সম্বোধন করত ‘আপনি’। আবদুল কাদের সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’-এ জড়িত ছিল, প্রায় সব কাজে ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষের মতো। তবে তাদের ‘আপনি’ সম্বোধন কখনও পরিবর্তন করেনি কেউ। আমার অগ্রজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও খ্যাতিমান শিক্ষক আশীষ দাশগুপ্তকে সে সর্বদা সম্মান দিয়েছে। অনুজ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক অসীম দাশগুপ্তও সর্বদা তাঁর স্নেহভাজন ছিল।
আরও পড়ুন >> আবুল হোসেনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গৈলা স্কুলের ১৯৯৩ সালে ছিল শতবার্ষিকী। আমাদের সময়ের কয়েকজন ছাত্র—শাহজাহান নবী, আবদুল গফুর, এম শাহআলম, মোল্লা মনসুরসহ কয়েকজন ১৯৯১ সালে সিদ্ধান্ত নিই- শতবর্ষ উপলক্ষে ১৬০০ বর্গফুটের একটি ‘শতবর্ষ ভবন’ নির্মাণ করা হবে। এ জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হবে সাবেক ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে। সাবেক প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান, মতিঝিলের একটি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মওলানা হারুনর-রশিদ এবং তাঁর ভাই আবদুল হাকিম আমাদের কাজে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেন। গৈলা স্কুলে আমার ও সৈয়দ আবুল হোসেনের সহপাঠী টমাস মানস কুমার দাস সে সময় একটি এনজিও-তে শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করত। তাঁর সূত্রে কাজের শুরুতে পেয়ে যাই দুই লাখ টাকা অনুদান। সৈয়দ আবুল হোসেন ততদিনে ডাসার ও কালকিনীতে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনা করে চলেছে। শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ-আবেগ-নিষ্ঠার কথা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। আবদুল কাদের এ সব কাজে তদারকি করত। সে আমাকে অনেকবার বলেছে—সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষা বিস্তারের কাজে গৈলা স্কুলকে মডেল বা আদর্শ মনে করে।
শতবর্ষ ভবন নির্মাণের এক পর্যায়ে ছাদ ঢালাইয়ের রড-সিমেন্ট কেনার সময় আমাকে ডেকে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেয় সৈয়দ আবুল হোসেন। শতবর্ষ পালনের প্রস্তুতিপর্বে তাঁর মতিঝিলের অফিসে আমরা অনেক সভা করেছি। সে বার বার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলত—‘আমি ব্যবসা করে উপার্জন করি। এর একটি অংশ জনকল্যাণ ও শিক্ষার প্রসারে ব্যয় করি। অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না। কিন্তু অনেকের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে অর্থ সংগ্রহ করা অনেক কঠিন কাজ। একমাত্র গৈলা স্কুলের পক্ষেই এমন মহৎ উদ্যোগ সম্ভব।’
আমরা ঢাকায় বসবাস করা গৈলার সাবেক শিক্ষার্থীরা গৈলা পরিষদ গঠন করি। প্রতি বছর আমাদের পুনর্মিলনী আয়োজন হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। তাঁর একান্ত ইচ্ছে ছিল ডাসারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একবার এ ধরনের পুনর্মিলনী আয়োজন। এ জন্য যাতায়াত, খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব ব্যয় তাঁর, অন্য কেউ যেন কিছু না করে কতবার এ কথা বলেছে। জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক স্বপ্ন পূরণ করেছে, কিন্তু নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীদের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে একত্র হবে এমন মহৎ স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেল। এ যন্ত্রণা, কষ্ট যে আমাকেও দগ্ধ করে চলবে!
গৈলা স্কুলের ১২৫ বছর উপলক্ষে আমরা ২০১৮ সালে ঢাকার কাছে নবাবগঞ্জে পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছিলাম। সৈয়দ আবুল হোসেন এ স্কুল থেকে ৫০ বছর আগে যারা এসএসসি পাস করেছে তাদের প্রত্যেককে বিশেষ ধরনের সুদৃশ্য ক্রেস্ট উপহার দিয়েছিল। ক্রেস্ট তৈরির কাজ সে নিজে তদারক করে। নিজের প্রতিষ্ঠান যে!
২০০০ সালে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গৈলা পরিষদের সমাবেশ হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সে সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান গৈলা স্কুলের সাবেক ছাত্র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার এম এ মালেক উপস্থিত ছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন অনুষ্ঠানে গৈলা স্কুলের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের জন্য পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করে। একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে এ তহবিল পরিচালিত হচ্ছে। গত প্রায় দুই যুগে এ তহবিল থেকে তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীকে প্রায় ৮ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ-প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরাও এ তহবিলের সহায়তা পায়। এখনও আমাদের ট্রাস্টের হাতে প্রায় ৮ লাখ টাকা রয়েছে। কয়েক মাস আগে শাহজাহান নবী, এম শাহআলম, আবদুল কাদের ও আমি তাঁর অফিসে ট্রাস্টের সভা করে আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করলে সে খুব সন্তুষ্ট হয়। বৃত্তি তহবিল পরিচালনার কাজে যুক্তদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে ‘অনেক প্রতিষ্ঠানে অর্থ সহায়তা দিয়েছি। কিন্তু গৈলা স্কুলের মতো সুন্দর তহবিল ব্যবস্থাপনা কোথাও দেখা যায়নি।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থে এ সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ পারে’। ২০২২ সালের ২৫ জুন সেতু উদ্বোধনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী একটি মহলের ভন্ডামি ও মিথ্যাচারের দুই শিকার ড. মশিউর রহমান ও সৈয়দ আবুল হোসেনকে পাশে রেখে সেতু উদ্বোধন করেছিলেন। তাদের যোগ্য সম্মান দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কী কঠিন ও যন্ত্রণাকর কয়েকটি বছর তাদের অতিক্রম করতে হয়েছে, অনেকের পক্ষেই তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মাত্র ২০ সদস্যর মন্ত্রিসভা গঠন এবং সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়ী করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছিল। তবে অপেক্ষাকৃত এক তরুণ নেতা ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসা আওয়ামী লীগের সরকারে মন্ত্রী হওয়ায় দলের মধ্যে কেউ কেউ খুশি হতে পারেনি। তারা নানাভাবে তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছিল, এটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
২০০৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলে সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সে অন্যান্য কাজের মধ্যে বিশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে পদ্মা সেতু নির্মাণে উদ্যোগী হয়। মাওয়া-জাজিরা এলাকার ফেরিঘাট আমাকে বরিশালের গৈলায় যাতায়াতের জন্য নিয়মিত ব্যবহার করতে হয়েছে বছরের পর বছর। সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় এ এলাকার মানুষের মনে আশাবাদ সৃষ্টি হয় এবার স্বপ্নের সেতু হবেই। সে কাজ শুরু করে প্রবল উৎসাহে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে ঋণের জন্য দৌড়ঝাঁপ করে। নকশা প্রণীত হয়। চীন এগিয়ে আসে। কিন্তু ফের ষড়যন্ত্র জোরদার হয়। দুর্নীতির অহেতুক অভিযোগ আনা হয়। ‘মিডিয়া ট্রায়াল ও সুশীল সমাজের ট্রায়ালের’ শিকার করা হয় তাকে। এর সূত্র ধরে শেখ হাসিনাকে দুর্বল করা এমনকি ক্ষমতাচ্যুৎ করার গভীর ষড়যন্ত্র চলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রথম দিন থেকে বলছিলেন কোনো দুর্নীতি হয়নি। সেতুর কাজে শুরু থেকে জড়িত খ্যাতিমান দুই প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিল রেজা চৌধুরী ও অধ্যাপক আইনুন নিশাত বার বার বলেছেন কোনো দুর্নীতি হয়নি। অবশেষে কানাডার আদালত বলেছে পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। গালগল্প ও গুজব রটিয়ে এ অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকও বলেছে পদ্মা সেতু থেকে সরে গিয়ে তারা ভুল করেছে। এ সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনা ‘পদ্মা সেতু চেতনা’-এর জন্ম দিয়েছেন। যেভাবে সৈয়দ আবুল হোসেন কাজ শুরু করেছিল, বিশ্বব্যাংক ষড়যন্ত্র না করলে ২০২২ সালের ২৫ জুনের আগেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হতো, সন্দেহ নেই।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থে এ সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ পারে’। ২০২২ সালের ২৫ জুন সেতু উদ্বোধনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী একটি মহলের ভন্ডামি ও মিথ্যাচারের দুই শিকার ড. মশিউর রহমান ও সৈয়দ আবুল হোসেনকে পাশে রেখে সেতু উদ্বোধন করেছিলেন। তাদের যোগ্য সম্মান দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কী কঠিন ও যন্ত্রণাকর কয়েকটি বছর তাদের অতিক্রম করতে হয়েছে, অনেকের পক্ষেই তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
সৈয়দ আবুল হোসেনের সাকো ইন্টারন্যাশনাল অফিস ছিল সবার জন্য অবারিত। প্রতিদিন সকালে তিনি অফিসে আসতেন। একের পর এক দর্শনার্থী তাঁর উদার সহায়তা পেয়ে হাসিমুখে বিদায় নিয়েছে। সবকিছু করতেন হাসিমুখে।
এত দ্রুত তিনি বিদায় নেবেন, কেউ ভাবেনি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তাঁর অভাব অনুভূত হবে। ব্যক্তিগতভাবেও কত লোক যে তাকে প্রতিদিন স্মরণ করে কষ্ট পেয়ে বলবে—আহা! আজ যদি সৈয়দ আবুল হোসেন থাকতেন!
গৈলা স্কুল এ প্রাক্তন ছাত্রকে অনেক অনেক দিন স্মরণ রাখবে, সন্দেহ নেই। তাঁর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা। তাঁর পরিবারের সদস্য ও সকল শুভানুধ্যায়ীর জন্য গভীর সমবেদনা।
অজয় দাশগুপ্ত ।। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের সাবেক সদস্য, বুয়েট সিন্ডিকেট সদস্য।

