পানামা খালের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে একটি জাহাজ। কিন্তু সমস্যা হলো, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়েই সেটি যেতে পারবে না। কারণ জাহাজটি এতই বড় যে খালটির ধারণক্ষমতাই তার চলাচলের জন্য যথেষ্ট নয়।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এমন জাহাজ সত্যিই ছিল। নির্মাণের ইতিহাসে মানবজাতিকে তাক লাগিয়ে দেওয়া সবচেয়ে বড় এই জাহাজটির নাম 'সিওয়াইজ জায়ান্ট'।
বিজ্ঞাপন
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে। শুরুটা করেছিল কাঠের নৌকায়, এরপর বিশাল পালতোলা জাহাজে। তবে আধুনিক যুগে এসে মানুষ সমুদ্রযাত্রাকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। মানুষ এমন সব জলযান তৈরি করেছে, যেগুলোকে শুধু জাহাজ বললে কম হয়ে যায়। একেকটি জাহাজ যেন সমুদ্রে ভাসমান শিল্পনগরী, তেলভান্ডার কিংবা ছোটখাটো শহর।

হাজার হাজার কনটেইনার, লাখ লাখ ব্যারেল তেল অথবা কয়েক হাজার যাত্রী নিয়ে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছুটে চলা এসব জাহাজ আধুনিক বিশ্বের নীরব নায়ক। বর্তমানে আমরা যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করি, যে পোশাক পরি কিংবা যে পণ্য অনলাইনে অর্ডার করি, তার বড় একটি অংশই কোনো না কোনো সময় এমন জাহাজের ডেকে ভ্রমণ করে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাহাজ
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজের কথা উঠলে সবার আগে আসে সিওয়াইজ জায়ান্টের নাম। ১৯৭৯ সালে জাপানে নির্মিত এই তেলবাহী জাহাজটি ৪৫৮ মিটার দীর্ঘ ছিল, যা প্রায় চারটি ফুটবল মাঠের সমান!
সংখ্যাটা শুনতে বড় লাগলেও বাস্তবে এর বিশালতা কল্পনা করা কঠিন। জাহাজটি এতটাই বড় ছিল যে এটি পানামা কিংবা সুয়েজ খালের কোনোটিই ব্যবহার করতে পারত না। এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ বন্দরও এটিকে নোঙর ফেলতে দেওয়ার মতো সক্ষম ছিল না। ফলে অনেক সময় গভীর সমুদ্রেই একে নোঙর করে রাখতে হতো।
![]()
২০১০ সালে সিওয়াইজ জায়ান্টের যাত্রা শেষ হলেও এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার আকারের রেকর্ড এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
‘সবচেয়ে বড়’ জাহাজ নির্ধারণ করা হয় যেভাবে
কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো জাহাজকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজের মোট দৈর্ঘ্য (Length Overall), প্রস্থ (Beam), পানির নিচের গভীরতা (Draft), বহনক্ষমতা বা ডেডওয়েট টনেজ (DWT), অভ্যন্তরীণ আয়তন বা গ্রস টনেজ (GT), কনটেইনার বহনক্ষমতা (TEU) এবং যাত্রী ধারণক্ষমতা।
তবে বিভিন্ন ধরনের জাহাজ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। তাই ক্ষেত্রভেদে ‘সবচেয়ে বড়’ জাহাজের সংজ্ঞাও পরিবর্তিত হয়।
বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন মহারাজারা
আজকের বিশ্বে অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে কনটেইনার জাহাজের ওপর। আরও বড়, আরও দক্ষ জাহাজ তৈরির প্রতিযোগিতায় এই খাতও থেমে নেই।
বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে এমএসসি ইরিনা এবং এমএসসি লোরেটো। প্রতিটি জাহাজে ২৪ হাজার ৩৪৬টি কনটেইনার বহন করা যায়।

এই সংখ্যা কতটা বড়?
একটু কল্পনা করুন তো! এসব কনটেইনার যদি ট্রাকে করে পরিবহন করা হয়, তবে সেই ট্রাকের সারি কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
বিশাল এসব জাহাজ অধিক পণ্য বহনের পাশাপাশি প্রতি কনটেইনারে পরিবহন খরচ কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। এসব জাহাজের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্যিক রুটগুলোতে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমোদতরী
জাহাজের কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে পণ্যবাহী বিশাল জলযানের ছবি। তবে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে ক্রুজ জাহাজ নামে সমুদ্রে আরেক ধরনের দৈত্যও রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রুজ জাহাজ ‘আইকন অব দ্য সিজ’, যার যাত্রীধারণ ক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৬০০ জন। তাদের সেবায় আরও ২ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োজিত থাকেন।
বিলাসবহুল এই জাহাজটিতে রয়েছে পার্ক, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার, সুইমিং পুল, শপিং জোন, ওয়াটার পার্কসহ নানা ধরনের বিনোদন সুবিধা। মজার ছলে অনেক পর্যটকই বলে থাকেন, এই জাহাজে কয়েক দিন কাটানোর পর তীরে নামার প্রয়োজনই পড়ে না। তাই ক্রুজ জাহাজকে অনেকেই ‘ভাসমান শহর’ বলে থাকেন।
সুপার ট্যাংকার: তেলের পাহাড় বহন করে যেসব জাহাজ
বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জ্বালানি পরিবহন খাত। আর এই খাতের অন্যতম ভরসা সুপার ট্যাংকার।
আরও পড়ুন: সমুদ্রের গভীরে ‘অদৃশ্য বাদুড়’: ডুবোজাহাজের রণকৌশলের নেপথ্য বিজ্ঞান
বর্তমানে তেলবাহী এই জাহাজগুলোর মধ্যে অন্যতম টিআই ওশেনিয়া, টিআই ইউরোপ, টিআই আফ্রিকা এবং টিআই এশিয়া।
একেকটি জাহাজে এত পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বহন করা যায়, যা একটি রাষ্ট্রের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করতে সক্ষম।
সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে এখনো এসব জাহাজের বিকল্প খুব কমই রয়েছে।

এত বড় জাহাজ ভাসে যেভাবে
বিশাল আকারের এসব জাহাজ দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এত ওজন নিয়ে এসব জাহাজ পানিতে না ডুবে ভাসে কীভাবে? চলুন জেনে নিই।
বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ নির্মাণের পেছনে কাজ করে অত্যাধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি। উন্নত হুল ডিজাইন, তরলগতিবিদ্যা (Hydrodynamics), এলএনজি-চালিত ইঞ্জিন, ডিজিটাল নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং উচ্চ-শক্তির ইস্পাত ও কম্পোজিট উপকরণ এসব জাহাজকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করে তুলেছে।
তবে সমুদ্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অগভীর পানিতে চলাচল, পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বন্দরের সীমাবদ্ধতা—সবকিছু মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা মোটেও সহজ নয়।
সব বন্দর এসব দৈত্যকে সামলাতে পারে না
যত বড় জাহাজ, তার জন্য প্রয়োজন তত বড় অবকাঠামো। তাই বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি বন্দরই এসব মেগা-জাহাজকে গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা রাখে।

এর মধ্যে চীনের সাংহাই, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম, দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান এবং বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প-ব্রুজ সেই তালিকার অন্যতম।
গভীর নাব্যতা, বিশাল জেটি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন ছাড়া এসব জাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
শেষ কথা
একসময় মানুষ ছোট কাঠের নৌকায় নদী পাড়ি দিত। আজ সেই মানুষই এমন জাহাজ তৈরি করেছে, যেগুলো একটি ছোট শহরের সমান বড়, হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে এবং বিশ্বের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোর গল্প শুধু প্রকৌশল দক্ষতার গল্প নয়; এটি মানুষের সাহস, কল্পনা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার গল্পও। আর সেই গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্রগুলোর একটি হলো সমুদ্রের বুকে ভাসমান এই দৈত্যগুলো।
এজেড




