চুরির ঘটনা তদন্তে ‘আগ্রহ কম’ পুলিশের

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০৭:৫৮ এএম
চুরির ঘটনা তদন্তে ‘আগ্রহ কম’ পুলিশের

দেশের যে কোনো স্থানেই চুরির ঘটনা ঘটলে সাধারণত থানায় মামলা করতে যান ভুক্তভোগী। সাধারণ নাগরিকদের ধারণা, মামলা করলে পুলিশ গুরুত্বের সাথে সেটি তদন্ত করবে। কিন্তু থানায় গেলে পুলিশের সদস্যরা ভুক্তভোগীকে মামলা না করে অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেন। আর মামলার পরিবর্তে জিডি হলে সেই ঘটনা তদন্তে পুলিশের আগ্রহ কম বলে অভিযোগ রাজধানীর ভুক্তভোগীদের।

হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক। স্বামী-স্ত্রী চাকরিজীবী হওয়ায় দিনের অধিকাংশ সময় তারা বাইরে থাকেন। তার বাসায় দিনদুপুরে চুরির ঘটনা ঘটলে তিনি হাতিরঝিল থানায় যান এবং মামলা নিতে বলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে বলে, আপনি আপাতত সাধারণ ডায়েরি করেন। আমরা তদন্তে নেমে সত্যতা প্রমাণ পেলে সেটি মামলায় রূপান্তর করব।

একই সময়ে হাতিরঝিল থানায় উপস্থিত ছিলেন আরেক ভুক্তভোগী যার বাসাতেও চুরির ঘটনা ঘটেছিল। সেই ব্যক্তি জানান, চুরির আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ ঘটনা তদন্তে শুধু বারবার তাকে থানায় ডেকেছে। কিন্তু চোরকে খুঁজে বের করতে তাদের আগ্রহ ছিল না।

আরও পড়ুন: পালিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিলে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার

ভুক্তভোগীরা বলছেন, থানায় যাওয়ার পর পুলিশের প্রথম প্রশ্ন হলো- আপনি কি কাউকে দেখেছেন বা আপনার কাছে কি কোনো সিসি ক্যামেরা ফুটেজ আছে। না থাকলে আপনি একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পেলে সেটা মামলায় রূপান্তর করব। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা নেওয়া হলেও সেখানে চোর অজ্ঞাত উল্লেখ করতে হয়।

জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় ভুক্তভোগীরা সবচেয়ে বেশি মামলা করতে যান মোবাইল চুরির অভিযোগে। যাদের কাছে আইএমও নাম্বার থাকে তারা অনেক ক্ষেত্রে মোবাইলটি ফেরত পান কিন্তু চোর ধরা হয়েছে কিনা তা জানতে পারেন না তারা।

দয়াগঞ্জের বাসিন্দা আশিক আহমেদ বলেন, একবার আমার ফোন হারালো। থানায় মামলা করলাম। ফোনটি উদ্ধারে নাকি ডিবির কাছে যন্ত্র আছে। এ জন্য চার্জ বাবদ টাকা চাইল আমার কাছে। টাকাও দেওয়া হয়নি, সেই ফোনও তিনি পাননি বলে জানান।

বাড্ডার আবুল কাসেম। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। দুই মাস আগে তার বাসার দরজা ভেঙে ল্যাপটপ চুরি করে নিয়ে যায়। পরে তিনি বাড্ডা থানায় মামলা করতে গেলে তারা কোনোভাবেই মামলা নিতে চায়নি। অনেক চেষ্টার পর মামলা নেওয়া হলেও তদন্তকারীর আচরণ দেখে তিনি অবাক হন। আবুল কাসেম বলেন, তদন্তকারীকে ফোন দিলেই বলতো আমরা চেষ্টা করছি।

বনশ্রী এলাকার রাশেদ আহমেদ। কয়েক মাস আগে তার বাসা থেকে একটি মোবাইল হারিয়ে যায়। তিনি রামপুরা থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা তাকে মামলা না করে জিডি করার পরামর্শ দিলে তিনি কিছু না করে বাসায় চলে আসেন। রাশেদ বলেন, চুরির মামলায় পুলিশের কাছে গেলে তারা জিডি করতে বলে। এটা কোনো কথা হলো। শুধু তাই নয়, চুরির মামলা তদন্তেও তাদের আগ্রহ কম। কিন্তু যদি বলেন প্রতারণার মামলা করব। সাথে সাথে নিয়ে নেয়। কারণটা আর নাইবা বললাম।

অবশ্য সম্প্রতি রাজধানীর চোরের একটা তালিকা তৈরি করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ঢাকায় ৩ হাজার ৬৪০ জন চোরের অস্তিত্ব মিলেছে, যারা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে সুযোগ পেলেই চুরি করছে।

>> আরও পড়ুন: জীবনে সিগারেটও স্পর্শ করেনি ফারদিন, চনপাড়ার গল্প ‘কাল্পনিক’

এ বিষয়ে রাজধানীর কয়েকটি থানার ওসির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কেউই নাম প্রকাশ করে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে কয়েকটি থানার ওসি জানান, মামলা নিতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রধান সমস্যা হলো- ভুক্তভোগীরা বেশিরভাগ সময় তাদের চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারে তৎপরতা দেখান। কিন্তু পরে মামলায় হাজিরা দেয়া এবং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দোষীকে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখান না। এর ফলে অধিকাংশ মামলা আদালতে যাওয়ার পর প্রমাণের অভাবে চোর জামিন পেয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন বাদী আদালতে অনুপস্থিত থাকায় এক পর্যায়ে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এসব কারণে বেশিরভাগ সময় চুরির ঘটনায় মামলা না নিয়ে তারা সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দেন।

অবশ্য কয়েকজন ওসি জানান, তাদের থানায় মামলা নিতে কোনো সমস্যা নেই। যদি কোনো পুলিশ সদস্য মামলার পরিবর্তে জিডি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তবে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপস) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, বাসা বাড়িতে ছোটখাটো চুরি হলে অনেকে থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করতে চান না। অন্যদিকে চুরির ঘটনার মামলা সিনিয়র পুলিশের অফিসাররা তেমনভাবে নজরদারি করেন না। এছাড়া এমন ঘটনায় কয়েকজনকে শোকজ করা হয়েছে। আর এই বিষয়ে মামলা নিতে সব থানাকে বলা আছে।

এমআইকে/জেএম/এএস