অযত্ন-অবহেলায় ১০ হাজার ইভিএমের ৬ হাজারেই ত্রুটি

প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৪ পিএম
অযত্ন-অবহেলায় ১০ হাজার ইভিএমের ৬ হাজারেই ত্রুটি
ছবি: সংগৃহীত

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দেড় লাখ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনে তখনকার নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য সারাদেশে কমিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়সহ একাধিক জায়গায় তা সংরক্ষিত রাখা হয়। এরমধ্যে রংপুরে রাখা ১০ হাজার ৭৪৯টির মধ্যে ছয় হাজারেরও বেশি ইভিএমে ত্রুটি ধরা পড়েছে।

আগামী ২৭ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইভিএম যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে এমন ত্রুটি ধরা পড়ে বলে জানা গেছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষে এসব ইভিএম যাচাই-বাছাই করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তাতে দেখা যায়, সংরক্ষিত ইভিএমের মধ্যে ছয় হাজার ৩৫টিতে ধরা পড়ে ত্রুটি, আর ১১২৩টি ইভিএমের মধ্যে কোনোটির যন্ত্রাংশ চুরি গেছে, কোনোটি উইপোকায় কেটেছে, অনেকগুলোর হদিসই নেই।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প কর্মকর্তারা রংপুরের ইভিএম পর্যবেক্ষণ শেষে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন। পাশাপাশি অতি স্পর্শকাতর এই ইভিএম সংরক্ষণে আট দফা সুপারিশ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

আগামী ২৭ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ইভিএম ছাড়াও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ইভিএমের এমন দশায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছে ইসি। এ জন্য রংপুরের ভোটের জন্য ঢাকা থেকে নতুন করে ইভিএম পাঠাচ্ছে সংস্থাটি।

এদিকে, রংপুরে পাওয়া ইভিএমের এমন চিত্র নিয়ে ইসিকে দেওয়া প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের চিঠিতে জানানো হয়, অধিকাংশ ইভিএমের প্যাকেট কেটে উইপোকা সব যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে অযত্ন আর অবহেলায় স্পর্শকাতর ইভিএমের যন্ত্রপাতির অধিকাংশই হয়ে গেছে অকেজো। রক্ষণাবেক্ষণের আগে আর ব্যবহার করা যাবে না সেসব যন্ত্র। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মজুদ করা ইভিএমগুলো দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

>> আরও পড়ুন: সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে সংকট বাড়বে

বিষয়টি নিয়ে রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা জি এম সাহাতাব উদ্দিন ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা শুধাংসু কুমার সাহার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও টেলিফোনে তাদের পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে দুজন নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। এমনকি ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া মেলেনি।

‘আগে কেনা ২৮ হাজার ইভিএম অকেজো’

রংপুরে সংরক্ষিত রাখা ইভিএমের যখন এমন হাল তখন দেশের অন্যসব জায়গার অবস্থা আরও বেশি নাজুক। গত নির্বাচনের পর ইসি সারাদেশের আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়গুলোতে মোট ৯৩ হাজার ইভিএম পাঠিয়েছিল। তারমধ্যে এর ৩০ শতাংশ বা প্রায় ২৮ হাজার ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অকেজো বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে তথ্য উঠে এসেছে।

গত সেপ্টেম্বরে ঢাকার বাইরে থাকা ইভিএমগুলোর অবস্থা জানতে মাঠে এমন চিত্র পান ইভিএম প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। যদিও ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ রাকিবুল হাসানের দাবি, ৩০ শতাংশ ইভিএম একেবারে নষ্ট হয়নি, এগুলো মেরামতযোগ্য।

তথ্য অনুযায়ী, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ইভিএম কেনার জন্য তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেয় নির্বাচন কমিশন। ওই প্রকল্পের অধীনে এক লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনা হয় তখন। এরমধ্য থেকে ৯৩ হাজার বিভিন্ন আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর বাইরে গাজীপুরে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ) রাখা হয় ৫৪ হাজার ৫০০ ইভিএম। আর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে রাখা আছে দুই হাজার ৫০০টি ইভিএম। ওই প্রকল্পে ইভিএমের ১০ বছরের ওয়ারেন্টি (বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা) থাকার কথা বলা হয়েছিল। এমন অবস্থায় দশ বছরের বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা থাকলেও মাত্র কয়েক বছরে কীভাবে এত ইভিএম নষ্ট হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

>> আরও পড়ুন: টাকা আর প্রশিক্ষণ পেলে ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট: ইসি আলমগীর

তবে প্রকল্পের আওতায় এসব ইভিএম কেনা হলেও তা সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কোনো বরাদ্দ না রাখায় এমন সমস্যা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ইভিএমগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় নির্বাচন অফিসের আলো-বাতাসহীন বদ্ধ কক্ষে পড়ে থেকে অকেজো হয়ে পড়ছে।

ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ রাকিবুল হাসান মনে করেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এমন জায়গায় ইভিএমগুলো রাখা হয়েছে, যেখানে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইভিএম কিনতে নতুন যে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তাতে এই যন্ত্র সংরক্ষণের জন্য ওয়্যারহাউসে (গুদামঘর) রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা থাকার পরও এত তাড়াতাড়ি ইভিএম নষ্ট হওয়ার বিষয় নিয়ে কথা বললে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ইভিএম হলো চুরির যন্ত্র। আমরা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করেছি। বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে এই যন্ত্র কেনার পর এখন দেখা যাচ্ছে ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। কমিশনের উচিত এ ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া। সংরক্ষণের ব্যবস্থা ঠিক না করে আবার ইভিএম কিনলে আরও বিপদ হবে।’

বিইউ/জেবি/আইএইচ