শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দক্ষ পেশাজীবী প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

দক্ষ পেশাজীবী প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের
বিদেশে থাকা মেধা কাজে লাগাতে চায় সরকার। ছবি: এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে দেশের সক্ষমতা বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিদেশে থাকা দক্ষ পেশাজীবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিনিয়োগ, গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে যুক্ত করতে চায় সরকার।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, সরকার মেধাপাচার নয়, বরং ‘মেধার আবর্তন’ (ব্রেন সার্কুলেশন) চায়। অর্থাৎ প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে কিংবা বিদেশে অবস্থান করেও দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অবদান রাখবেন।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্র সফরে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, সেখানকার কয়েকজন বাংলাদেশি পেশাজীবী ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন। অন্যরাও স্থায়ীভাবে দেশে না ফিরেও বিনিয়োগ, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে অবদান রাখতে আগ্রহী।

আরও পড়ুন

মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে মেধার মূল্যায়ন জরুরি: শায়খ আহমাদুল্লাহ

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মেধাপাচারের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে যেতে চাই। আমরা মেধার আবর্তন চাই। আমরা তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই।’

সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প ও ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত শিল্পের বাইরে দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করতেও এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মেধার পাচার ঠেকাতে চায় সরকার। ছবি: সংগৃহীত
মেধার পাচার ঠেকাতে চায় সরকার। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে বাংলাদেশকে এআই, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার অঙ্গীকার রয়েছে। এ খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এআই-চালিত ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় মেধা ও জনশক্তি রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী এ ক্ষেত্রে বড় সম্পদ।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে গুরুত্ব

তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে উচ্চমূল্যের রফতানি ও দক্ষ কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে চায় সরকার। গত ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেন।

এ খাতে বিনিয়োগ প্রণোদনা, বিশেষায়িত অবকাঠামো, গবেষণা অংশীদারিত্ব ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন

জাপানে ভাষার দেয়ালে চাপা পড়ছে বাংলাদেশিদের স্বপ্ন

শামা ওবায়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ডেটা সংরক্ষণ ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশের উপযোগী এআই গড়তে চায় সরকার

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে কৃষি, ব্যবসা, নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে চায়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের এআই প্রয়োজন, সেটি বিবেচনা করা জরুরি। একজন কৃষক কীভাবে কৃষিকাজে এআই ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারেন, কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নারী উদ্যোক্তারা কীভাবে এ প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারেন, সেদিকে নজর দিতে হবে।

তাঁর মতে, এআইয়ের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। এ উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের প্রস্তাবিত মানবকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতিরও সামঞ্জস্য রয়েছে। নীতিটিতে দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, তথ্য সুরক্ষা, নৈতিক ব্যবস্থাপনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব

যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে বৈঠক করেছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। ছবি: সংগৃহীত
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। ছবি: সংগৃহীত

শামা ওবায়েদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে উঠলে গবেষক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি বৈশ্বিক উদ্ভাবন নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়বে।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। অ্যাপলের বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যথাযথ নীতি, অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব।

বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব

প্রযুক্তি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্বচ্ছ, নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।

সরকারের প্রযুক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্টার্টআপ অর্থায়ন, উদ্ভাবনে প্রণোদনা, ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলোও রয়েছে।

আরও পড়ুন

‘চড়া কর’ গিলে খাচ্ছে আয়, স্বজনদের চাপে দিশেহারা জাপানপ্রবাসীরা

শামা ওবায়েদ আশা প্রকাশ করেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মেধা ও অভিজ্ঞতা, বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু মেধাপাচার ঠেকানো নয়; বরং বাংলাদেশ ও বিশ্বের উদ্ভাবনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে মেধা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও জ্ঞানের দ্বিমুখী বিনিময়ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। সূত্র: বাসস

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর