শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বসানোর প্রতিবাদে মেলার অস্থায়ী প্রাথমিক স্থাপনায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ভাঙচুর চালিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, তারা তাদের মাঠে এমন কোনো মেলার আয়োজন করতে দেবেন না।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ১টা ২০ পর্যন্ত তারা ভাঙচুর চালিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী দুপুর ১২টায় বাণিজ্য মেলার মাঠে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও ভাঙচুরের জন্য আনা হয় জমি চাষের দুটি ট্রাক্টর। একটি পিকআপ ভ্যানে মাইক লাগিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নানা নির্দেশনা দেয়াও হয়।
অন্যদিকে চীন মৈত্রী সম্মেলন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থান করেন পুলিশ সদস্য। কিন্তু এ সময় ভাঙচুর কার্যক্রমে তাদের কোনো বাধা দিতে দেখা যায়নি।

দুপুর ১টার দিকে মেলার গেটে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ভাঙচুর শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘আমলা সচিব বাইরে যাক, আমার ক্যাম্পাস আমার থাক’; জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন।
এর আগে দুপুর পৌনে ১টার দিকে গেট ভাঙচুরের জন্য নিয়ে আসা ট্রাক্টর দিয়ে মেলার গেট ভাঙা হয়। ট্রাক্টর দিয়ে যখন কোনোভাবে গেটটি ভাঙচুর করা সম্ভব হচ্ছিল না; তখন শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বড় বড় বাঁশ হাতে নিয়ে একযোগে গেটে ভাঙচুর চালায়। সবশেষে দুপুর সোয়া ১টার দিকে তারা এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার প্রধান গেট ভাঙচুর করতে সক্ষম হয়।
দুপুরে ট্রাক্টর দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরের পাশাপাশি মাঠের জমি চাষ করে দেওয়া হয়। দুপুর বারোটার আগে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী জড়ো হন।
মাঠে ভাঙচুর করতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। তারা নিজেদের গবেষণার মাঠ ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন বলে জানান শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের পেছনের কারণ তুলে ধরে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রূপা আক্তার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপি সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে আমরা দাবিসমূহ উল্লেখ করে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই আমাদের দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, একটি শিশু যেমন খাবারের জন্য কান্না করতে থাকে; যতক্ষণ না তার মা তাকে খাবার দেন, আমাদের অবস্থাও তেমনি হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।
আন্দোলনের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা নয় উল্লেখ করে রূপা আক্তার বলেন, আমাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য নিজেদের গবেষণার মাঠ ফিরে পাওয়া এবং সেখানে পুনরায় গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের একটাই দাবি, গবেষণার মাঠ আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক। সচিবালয়ে বসে নয়, আমাদের গবেষণার মাঠে ফিরিয়ে দিয়েই গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠ ফিরে পাওয়ার দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে পরিবেশ, জনসাধারণের চলাচল এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, কার্বন শোষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে সেখানে কার্বন শোষণের বাস্তব সক্ষমতা ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল এলাকায় প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে সাধারণ মানুষ হাঁটতে আসেন। অনেকে এখানে অবসর সময় কাটান। কিন্তু এ এলাকায় সচিবালয় নির্মাণ করা হলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার কারণে সাধারণ মানুষের অবাধ চলাচল ও বিনোদনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
আরাফাত আরও বলেন, অতীতে শেখ হাসিনা সরকারের সময় জিয়াউর রহমানের সমাধি ঢাকা থেকে স্থানান্তরের উদ্যোগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। এখন ঢাকার ভেতরে সচিবালয় স্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে এর পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজনে সমাধিস্থলটির ওপর কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি পুরো জাতির কাছেও প্রশ্ন রাখতে চাই।
গবেষণা মাঠের মালিকানা প্রসঙ্গে আন্দোলনে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের একটি কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে সচিবদের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
নিজেদের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারা জানান, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমিটিকে গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এজন্য জমিতে ঘাস লাগানো, মাটির গঠন উন্নত করা এবং পর্যায়ক্রমে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তারা আরও জানান, গতকাল কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গেও তাদের কথা হয়েছে এবং মন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন। শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জমিটিকে পরিচর্যা ও উন্নয়নের মাধ্যমে উর্বর করে গবেষণার উপযোগী করতে চান।
শেরে বাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা তাদের এই ভাঙচুরে কোন ধরনের বাধা দেব না। আমরা চাই তারা শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে যাক।
এমআইকে/এফএ




