সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জলবায়ু পরিবর্তনে গ্রামছাড়া, অনিশ্চিত জীবন শহরেও

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

জলবায়ু পরিবর্তনে গ্রামছাড়া, অনিশ্চিত জীবন শহরেও

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বসতভিটা, জীবিকা ও চেনা পরিবেশ হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছেন মানুষ। কিন্তু শহরে এসেও মিলছে না নিরাপদ আশ্রয় কিংবা স্বস্তির জীবন। বরং বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, তীব্র গরম, জলাবদ্ধতা, রোগব্যাধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবহেলা ও উচ্ছেদের আতঙ্কে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।

ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরার ১০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত নগর দরিদ্রদের এমন সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার (২ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বারসিক ও সিডব্লিউএফ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি ও নগর দরিদ্রদের সংকট’ শীর্ষক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনযাপন, গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং শহরের বস্তিতে তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের নানা দিক তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে ৩৪টি ঢাকার, ৩৩টি রাজশাহীর এবং ৩৩টি সাতক্ষীরার। এসব পরিবারের শহরমুখী হওয়ার পেছনে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ বস্তিবাসী গ্রাম থেকে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মানুষের বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সিডর, আইলা, আম্পান ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় জনপদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে ঘরবাড়ি ও মিষ্টি পানির উৎস নষ্ট করছে। ফসলি জমিতে দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানি জমে থাকায় সেসব জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মিঠাপানির মাছের চাষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে।

ঢাকায় আসা পরিবারগুলোর আদি নিবাস ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায়। রাজশাহীর বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন রাজশাহীর পবা ও চারঘাট, নওগাঁর আত্রাই, নাটোরের লালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধা থেকে আসা মানুষ। অন্যদিকে সাতক্ষীরার বস্তিতে বসবাসকারীদের অনেকেই এসেছেন শ্যামনগরের গাবুরা, খুলনার কয়রা ও মহেশ্বরীপুর এলাকা থেকে।

প্রতিবেদনে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোর সংকটও তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি ও তীব্র খরার কারণে এসব অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। গভীর নলকূপ দিয়েও পর্যাপ্ত সেচের পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষকেরা ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছেন। কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় গ্রামীণ দিনমজুরদের কাজের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। একপর্যায়ে জীবিকার তাগিদে তাদের শহরমুখী হতে হচ্ছে।

গ্রাম হারানোর সঙ্গে হারাচ্ছে প্রকৃতি ও সংস্কৃতিও

বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট কেবল বসতভিটা হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষেরা গ্রামীণ পরিবেশে ঋতু পরিবর্তনের চেনা নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। একসময় বাংলায় ছয়টি ঋতুর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। আষাঢ়-শ্রাবণে নিয়মিত বৃষ্টি হতো, যা কৃষিকাজের জন্য সহায়ক ছিল। কিন্তু এখন বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়ের অনিয়মিত পরিবর্তন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।

গ্রামে থাকতে প্রবীণ মানুষেরা মেঘের রং, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, পিঁপড়া ও ব্যাঙের আচরণ দেখে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সেই নিবিড় সম্পর্কও ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।

একসময় নদী, খাল, বিল ও উন্মুক্ত জলাশয় থেকে পুঁটি, টেংরা, টাকি, শিং, মাগুর ও বাইমের মতো দেশি মাছ সংগ্রহ করতে পারতেন গ্রামের মানুষ। বাড়ির আশপাশে জন্মাত নানা ধরনের শাকসবজি ও ঔষধি গাছ। আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা ও বরই ছিল সহজলভ্য। শহরে এসে এসব প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তারা। এখন প্রতিটি খাবার বাজার থেকে কিনতে হয়। এতে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যব্যয় আরও বেড়েছে।

প্রকৃতির পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিও। নৌকাবাইচ, যাত্রাপালা, বাউল গান, গম্ভীরা, জারি-সারি ও চৈত্রসংক্রান্তির মেলার মতো আয়োজন একসময় গ্রামীণ মানুষের বিনোদন ও সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। শহরের যান্ত্রিক জীবন ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এসব সাংস্কৃতিক চর্চা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন বাস্তুচ্যুত মানুষ।

বস্তিতে জীবনযাপন যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ

গ্রাম ছেড়ে শহরে এলেও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অপেক্ষা করে না নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের বস্তিগুলোতে কাঠ, বাঁশ, পুরোনো টিন ও পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয় তাদের। ঘরগুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ নেই। শত শত মানুষের জন্য থাকে মাত্র কয়েকটি সাধারণ শৌচাগার, যেগুলোর অনেকগুলোই অপরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারের অনুপযোগী।

বস্তিতে রান্নার জন্য গ্যাসের সংযোগ না থাকায় অনেক পরিবার কাঠ ও কয়লার চুলা ব্যবহার করে। এসব চুলার ধোঁয়ায় ঘরের ভেতরের পরিবেশ দূষিত হয়। গ্রীষ্মকালে টিনের চালের ঘরগুলো প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে ঘরের ভেতরে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে কিংবা ঘন ঘন লোডশেডিং হলে ঘরের ভেতরে অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়ে। তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্করা পানিশূন্যতা, জ্বরসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন।

বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিচু এলাকার বস্তিগুলো দূষিত পানিতে ডুবে যায়। নর্দমার বর্জ্যমিশ্রিত পানি ঘরে প্রবেশ করে বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভিজিয়ে দেয়। জমে থাকা পানিতে চলাচল করতে গিয়ে চর্মরোগ, চুলকানি ও বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাও তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। পানির লাইনে দাঁড়ানো কিংবা সামান্য বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। মাদকাসক্তদের উপদ্রব, রাতে মোবাইল ও রিকশার ব্যাটারি চুরির আশঙ্কা এবং নিরাপত্তার অভাব নারীদের ও কিশোরীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে।

দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফেরিওয়ালাদের মতো পেশার মানুষের আয় অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা কিংবা তীব্র শীতে কাজ বন্ধ থাকলে পরিবার নিয়ে অনাহারে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্ছেদের আতঙ্ক। রেলওয়ে কিংবা সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা বস্তিগুলো যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় স্থায়ী ঠিকানা ছাড়াই অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হয় তাদের।

শহরে পরিচয় হারায় মানুষ, বাড়ে একাকিত্ব

প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সামাজিক ও মানসিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রাম থেকে শহরে আসার পর নাগরিক সমাজের অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। পোশাক, ভাষা ও পেশার কারণে অনেককে নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শহরে এসে অনেকের নিজস্ব নাম ও সামাজিক পরিচয় যেন হারিয়ে যায়। নারীদের ‘বুয়া’, ‘খালা’ কিংবা ‘কাজের মেয়ে’ এবং পুরুষদের ‘রিকশাওয়ালা’, ‘মামা’ কিংবা ‘কুলি’ বলে সম্বোধন করা হয়। এ ধরনের পরিচয়হীনতা ও অবমাননাকর আচরণ তাদের আত্মসম্মানে আঘাত করে।

এ ছাড়া কোনো বাসাবাড়িতে চুরি কিংবা অপরাধের ঘটনা ঘটলে অনেক সময় বস্তির বাসিন্দা ও গৃহকর্মীদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তাদের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এতে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামে প্রতিবেশীর বিপদে মানুষ যেভাবে এগিয়ে আসত, শহরে সেই সামাজিক বন্ধন অনেকটাই অনুপস্থিত। পাশাপাশি বসবাস করেও একে অপরের খোঁজ রাখেন না অনেকে। ফলে লাখো মানুষের ভিড়ের শহরে বসবাস করেও বাস্তুচ্যুত মানুষদের মধ্যে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হচ্ছে। তাদের অনেকেই সুযোগ পেলে আবার নিজ গ্রামে ফিরে যেতে চান। জীবনের শেষ সময়টুকু চেনা পরিবেশে কাটানো এবং নিজেদের পরিচিত মাটিতে সমাহিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে তাদের।

স্থায়ী আবাসন ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিল চান বাস্তুচ্যুতরা

এত সংকটের মধ্যেও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে কিছু প্রত্যাশা রয়েছে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর। প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন ও সক্ষমতা তৈরিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব এলাকা থেকে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, সেসব এলাকায় অথবা কাছাকাছি শহরে তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করে পুনর্বাসন করতে হবে। বস্তির ঘরগুলোর মানোন্নয়নে সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তাদের জন্য ক্ষয় ও ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হিসেবে উঠে এসেছে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আবাসনের দাবি। এমন একটি ঠিকানা, যেখানে উচ্ছেদের ভয় থাকবে না, থাকবে না প্রতিদিন ঘর হারানোর অনিশ্চয়তা। যেখানে অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন তারা।

এম/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর