সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের সংকট, নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের সংকট, নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক: টিআইবি
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ ও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর এবং পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হচ্ছে। একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদে থাকায় নেতৃত্বের পরিবর্তন ও জবাবদিহির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যালোচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১০টিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব দলের মধ্যে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দেশের বহু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক কার্যক্রম শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে দল ভেঙে যেতে পারে কিংবা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে দলের শীর্ষ পদে থাকছেন।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সময়কাল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে পাঁচটি দলের প্রধানের নেতৃত্বের মেয়াদ ১০ থেকে ২০ বছর এবং সাতটি দলের প্রধান ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্বে রয়েছেন। বাকি ২০টি দলের প্রধানের নেতৃত্বের মেয়াদ ১০ বছরের কম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান ৪৫ বছর এবং বিএনপির দলীয় প্রধান ৪১ বছর দায়িত্বে ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির দলীয় প্রধান পদে পরিবর্তন এসেছে।

দলগুলোর গঠনতন্ত্রে জাতীয় কাউন্সিল বা কনভেনশনকে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরাম হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮টি দলের কাউন্সিল নিয়মিত হয় না। যেসব দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়।

এ ছাড়া জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোকে মূলত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নির্বাচনি প্রচারণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে তৃণমূলের মতামত দেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনেও স্বচ্ছতার ঘাটতি চিহ্নিত করেছে টিআইবি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদের উল্লেখ নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গঠনতন্ত্রে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সুস্পষ্ট বিধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নাগরিক ঐক্য ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে স্থানীয় কমিটির মেয়াদ সম্পর্কে কোনো বিধান নেই। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থানীয় কমিটি গঠনের নিয়মাবলি নির্ধারণ করে। স্থানীয় পর্যায়েও একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকার প্রবণতা রয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও আইনি নির্দেশনা লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী, দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার সময় কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ডকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বিবেচনা করতে হয়। তবে অধিকাংশ দল এই বিধান অনুসরণ করছে না। বরং মনোনয়ন বোর্ডের সাক্ষাৎকার ও আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যেখানে দলীয় প্রধানের মতামত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট শর্ত নেই। মাত্র ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব শর্তও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়।

প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বড় ও প্রভাবশালী দলগুলোতে আর্থিক সামর্থ্য এবং পেশিশক্তিকে প্রার্থী হওয়ার অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৩ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ থেকে দলীয় প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট দলে ন্যূনতম তিন বছর সক্রিয় সদস্য থাকার শর্ত বাতিল করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, ওই পরিবর্তন এখনো বহাল রয়েছে।

টিআইবির গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন, কমিটি গঠন, নীতিনির্ধারণ ও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি দলগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর