প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলাদেশের জন্য জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা চলমান থাকা এবং তা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রও আরও প্রশস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-কে ভিত্তি করে এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে যোগাযোগ, পরিবেশ, কৃষি, মানবসম্পদ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা, টেকসই অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে জাপানের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরেও জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনে (জেট্রো) বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
‘বিগ-বি নিয়ে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশের প্রসঙ্গ আসেনি’
জাপানের সঙ্গে বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) নিয়ে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশের প্রসঙ্গ আসেনি বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, বিগ-বি নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ উদ্যোগে অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করা কিংবা বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্রপথ নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে বৃহত্তর শিল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কি না– জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতেও তৃতীয় কোনো দেশের উল্লেখ নেই।
তিনি বলেন, অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে বসেই এ ধরনের আলোচনা করতে হবে। জাপানের সঙ্গে এবারের আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে নিয়ে কথা হয়নি।
‘যৌথ বিবৃতি না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়’
বিগ-বি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার একান্ত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার এই অংশীদারত্বের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সমুদ্রপথ নিয়ে জাপানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর কিংবা সমুদ্রপথ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উপস্থিতি প্রয়োজন।
বিগ-বি ও মাতারবাড়ি প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দলটির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান বুঝতে জাপান সফরের যৌথ বিবৃতি পড়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যৌথ বিবৃতি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। না দেখে, না বুঝে বা না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
‘কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না’
জাপানের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এবং ঋণের সুদের হার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো ঋণ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।
তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে বাংলাদেশ ঋণ, সহজ শর্তের ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ বিনিয়োগ অংশীদার হতে চায়। যেসব দেশের সঙ্গে ব্যবসা হবে, তা হবে পারস্পরিক বিনিয়োগের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
জাপানের ঋণের সুদের হার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান, বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি সুদে জাপানের ঋণ নেওয়া হবে কি না।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের। কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অন্যান্য বিকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হবে—এমন বিনিয়োগই গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাছাই করার সুযোগ রয়েছে।
‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে জাপান’
জাপান সফরে রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়– সব পর্যায়েই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। এ বিষয়ে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তবে সংকটের মূল সমাধান মিয়ানমারের হাতে। দেশটিকে আলোচনায় আসতে হবে এবং সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
গত ২৬ অক্টোবর সরকারি সফরে জাপানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।
সফরে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয় এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে একটি জাপানি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের দুটি ‘ইয়েন-লোন’ (ঋণ সহায়তা) প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এসব চুক্তির মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত অনুদান সহায়তার চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এএম




